বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণে জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণে জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর

অপরাধ ডেস্ক

বিএনপির নিখোঁজ শীর্ষস্থানীয় নেতা এম ইলিয়াস আলীকে তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান অপহরণ করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তার সাবেক এক সহকর্মীর দেওয়া জবানবন্দিতে এই তথ্য উঠে এসেছে।

রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত ও বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ইলিয়াস আলীর অপহরণের ঘটনায় সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে।

এদিন সকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একমাত্র আসামি হিসেবে সাবেক কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তার উপস্থিতিতেই আদালতে জবানবন্দি দেন মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সাক্ষী। জবানবন্দিতে সাক্ষী ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে সংঘটিত ওই অপহরণ প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট বিবরণ এবং পরবর্তী ঘটনাবলি আদালতের সামনে তুলে ধরেন।

সাক্ষীর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল তৎকালীন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সদরদপ্তর থেকে মেজর জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ এবং সাইফ নামক অপর এক কর্মকর্তাসহ একটি দল মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছাকাছি অবস্থান নেয়। তৎকালীন সময়ে অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে ঘটনাস্থলে অবস্থানকালে জিয়াউল আহসান বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন এবং ‘টার্গেট’ বা লক্ষ্যবস্তুর আগমনী বার্তা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। পরবর্তীতে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি না আসায় সেদিনের মতো অভিযান স্থগিত করা হয়।

জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই ঘটনার পরদিন উক্ত কর্মকর্তা নয় দিনের ছুটিতে নিজ এলাকায় চলে যান। ছুটিতে থাকাকালীন ১৮ এপ্রিল তিনি গণমাধ্যমের সূত্রে জানতে পারেন যে, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে মহাখালী এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ছুটি শেষে ২৩ এপ্রিল র‍্যাব সদরদপ্তরের গোয়েন্দা শাখায় (ইনটেলিজেন্স উইং) পুনরায় যোগদানের পর তিনি কর্মস্থলে একটি অস্বাভাবিক ও থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করেন। নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টায় রোল-কল বা হাজিরা সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও, ১৮ এপ্রিলের পর থেকে তা এগিয়ে সকাল ৭টায় সম্পন্ন করা হতো এবং জিয়াউল আহসান নিয়মিত ভোরে দপ্তরে উপস্থিত হতেন।

সাক্ষী তার জবানবন্দিতে একটি সুনির্দিষ্ট টেলিফোন সংলাপের বিবরণ দিয়ে জানান, কর্মস্থলে অবস্থানকালে তিনি জিয়াউল আহসানকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ‘তারিক স্যার’ নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপে লিপ্ত হতে শোনেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে জিয়াউল আহসান ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “আপনাদের কথামতো ইলিয়াস আলীকে গলফ (গুম) করলাম। এখন আপনারা এরকম করলে হবে? আমি কমান্ডো মানুষ। তাহলে পোস্টিং দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দিন।” এছাড়া, ইলিয়াস আলীকে গুম করার প্রক্রিয়াটি গোপন রাখার উদ্দেশ্যে র‍্যাব সদরদপ্তরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ জিয়াউল আহসানের নির্দেশে ধ্বংস করা হয়েছিল বলেও জবানবন্দিতে দাবি করা হয়।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকা বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর অন্তর্ধানের বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বহুল আলোচিত এবং সংবেদনশীল অধ্যায়। বর্তমান ট্রাইব্যুনালের এই তদন্ত এবং সাবেক সহকর্মীর দেওয়া জবানবন্দি দেশের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আইনি তদন্তে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই জবানবন্দি ও তথ্য-প্রমাণাদি বিগত সরকারের আমলে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সংঘটিত গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত নীতি-নির্ধারক ও বাস্তবায়নকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ