ভারতে প্রথম চিপ নির্মাণ কারখানা: টাটা ও ডাচ জায়ান্ট এএসএমএল-এর ঐতিহাসিক চুক্তি

ভারতে প্রথম চিপ নির্মাণ কারখানা: টাটা ও ডাচ জায়ান্ট এএসএমএল-এর ঐতিহাসিক চুক্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দেশীয় প্রযুক্তিতে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদন শিল্পকে স্বাবলম্বী করতে এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। দেশটির গুজরাট রাজ্যে ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক ‘ফ্রন্ট-এন্ড সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট’ (চিপ তৈরির কারখানা) নির্মাণের লক্ষ্যে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী টাটা ইলেকট্রনিক্স এবং নেদারল্যান্ডসের বিশ্বখ্যাত চিপ তৈরির সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এএসএমএল একটি কৌশলগত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে শনিবার (১৬ মে) দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ফটোলিথোগ্রাফি প্রযুক্তির একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণকারী ডাচ প্রতিষ্ঠান এএসএমএল তাদের সর্বাধুনিক লিথোগ্রাফি সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সমাধান দিয়ে টাটার এই বৃহৎ প্রকল্পে সহায়তা করবে। গুজরাটের ধোলেরায় প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯১ হাজার কোটি রুপি) ব্যয়ে এই আধুনিক কারখানাটি যৌথভাবে তৈরি করছে টাটা ইলেকট্রনিক্স ও তাইওয়ানের পাওয়ারচিপ সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কর্পোরেশন (পিএসএমসি)। এই কারখানায় মূলত গাড়ি, মোবাইল ফোন, কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত ৩০০-মিলিমিটারের (১২ ইঞ্চি) আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ওয়াফার ও চিপ উৎপাদন করা হবে। কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার ওয়াফার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২৮ থেকে ১১০ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত হবে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এএসএমএল-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্রিস্টোফ ফুকে বলেন, “ভারতের সেমিকন্ডাক্টর খাতের দ্রুত বিকাশ বৈশ্বিক বাজারের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আমরা এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” অন্যদিকে টাটা ইলেকট্রনিক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. রণধীর ঠাকুর জানান, এএসএমএল-এর বিশ্বমানের লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি ধোলেরা প্ল্যান্টের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে এবং বৈশ্বিক গ্রাহকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য চিপ সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেতেনের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে দুই নেতা জ্বালানি, বন্দর, নবায়নযোগ্য শক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের শীর্ষস্থানীয় ডাচ ব্যবসায়ীদের সাথে একটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী ডাচ কোম্পানিগুলোকে ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান এবং এই অংশীদারিত্বকে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম ও যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত লক্ষ্য। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিপের বাজারে সরবরাহ ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্বের (টেক ওয়ার) কারণে ডাচ কোম্পানিগুলো চীনের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ও স্থিতিশীল বাজার খুঁজছে। ভারত সরকারও নিজেদের দেশে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর হাব গড়ে তুলতে উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা (পিএলআই) প্রকল্পের আওতায় শত শত কোটি ডলারের সরকারি ভর্তুকি ঘোষণা করেছে। এই ধোলেরা প্রকল্পের মোট খরচের প্রায় ৭০ শতাংশই ভারতের কেন্দ্রীয় ও গুজরাট রাজ্য সরকার যৌথ ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করছে। এই প্রেক্ষাপটে টাটা ও এএসএমএল-এর এই যৌথ উদ্যোগ ভারতকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ