জাতীয় ডেস্ক
মেগাসিটি ঢাকার যানজট সমস্যা দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা চরম রূপ ধারণ করেছে। সড়কের অপরিকল্পিত ব্যবহার, চালকদের আইন অমান্যের প্রবণতা এবং সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থার অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সড়কে নির্দিষ্ট লেনের অনুপস্থিতি, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার আধিপত্য, উল্টোপথে চলাচল, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও যাত্রী ওঠানো-নামানোসহ সুনির্দিষ্ট ১০টি কারণে রাজধানীজুড়ে দৈনিক হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সুনির্দিষ্ট খাতগুলোতে শৃঙ্খলা না ফেরালে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন অসম্ভব।
রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক, খিলক্ষেত, কুড়িল, নতুনবাজার, বাড্ডা ও রামপুুুুরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরে দেখা গেছে, গণপরিবহনগুলোর যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো ও নামানোর প্রতিযোগিতা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ ব্যবহার না করে চালকরা রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে গাড়ি থামিয়ে রাখছেন। এর ফলে পেছনের অন্য যানবাহনগুলো অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিমানবন্দর ও প্রগতি সরণির বিভিন্ন অংশে প্রতিদিন অসংখ্য গণপরিবহন এভাবে রাস্তা ব্লক করে যাত্রী তোলায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা। একই সঙ্গে ব্যস্ততম প্রধান সড়কগুলোতে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো লেন না থাকায় তীব্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের যত্রতত্র লেন পরিবর্তন এবং ফাঁকা জায়গা দিয়ে প্রবেশের প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়াচ্ছে, তেমনি সামগ্রিক গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে বিভিন্ন এভিনিউ ও লিংক রোডের মোড়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত আধিপত্য। বিশেষ করে মতিঝিল ও কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা এবং বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনের নিচে সারিসারি অটোরিকশা সড়ক দখল করে রাখছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম। অনেক সময় সুনির্দিষ্ট সমন্বয় ছাড়া সড়কের একাংশ বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার কাজ চলায় অন্য পাশের রাস্তায় যানবাহনের চাপ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা ঢাকার চালকদের মধ্যে অন্যতম মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যেসব এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্যামেরা নেই, সেসব স্থানে চালকরা ট্রাফিক সংকেত এবং দিক-নির্দেশনা অবলীলায় উপেক্ষা করছেন। এমনকি প্রধান সড়কে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর মতো বিপজ্জনক ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। এর পাশাপাশি ঢাকার সড়কে ধারণক্ষমতার চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা অত্যাধিক, যা অল্পসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করলেও সড়কের একটি বড় অংশ দখল করে রাখে। এর ওপর আবার উত্তরা-আবদুল্লাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতের বেলা এবং দিনের ব্যস্ত সময়ে দূরপাল্লার বাস, প্রাইভেটকার ও মিনি ট্রাক প্রধান সড়কে অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখায় রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর সড়ক দখল করে বসা অস্থায়ী ভ্যান ও দোকানপাট এবং নতুনবাজার থেকে গুলশানের মতো লিংক রোডগুলোতে শাখা রাস্তায় সময়মতো ঢুকতে না পারার কারণেও মূল সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের জন্য ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও রুট পারমিট প্রক্রিয়াকে দায়ী করছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক এই বিষয়ে বলেন, সড়কের বর্তমান বিশৃঙ্খলার জন্য মূলত আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) অদক্ষতা এবং বিজ্ঞানসম্মত রুট পারমিট ব্যবস্থার অভাব দায়ী। বর্তমানে একই কোম্পানির ব্যানারে বিভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন মালিকের বাস চলাচল করার ফলে চালকদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। রাস্তায় কে কার আগে যাত্রী তুলবে—এই মানসিকতাই যানজট ও বিশৃঙ্খলার মূল উৎস।
এই চরম অব্যবস্থাপনা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ মনে করছে, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, যত্রতত্র বাস থামানো ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে হলে ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বা বাসের রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি দ্রুত এবং পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে অনেক বাস রুট পারমিট ছাড়াই ঢাকার সড়কে চলাচল করছে এবং প্রচলিত নিয়ম মানতে চাইছে না। সমস্ত গণপরিবহনকে যখন একটি সমন্বিত ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসা সম্ভব হবে, তখনই কেবল রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী শৃঙ্খলা ফিরবে।


