জাতীয় ও মফস্বল ডেস্ক
দেশের অভ্যন্তরে টানা ভারি বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যেই তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারসহ বেশ কিছু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলা এবং সিলেট বিভাগে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের আবাদি জমি তলিয়ে যাওয়ায় চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অরুণাচল ও মেঘালয় রাজ্যে ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে দেশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটির সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নদীগুলোর পানিপ্রবাহ আরও কিছু দিন বিপৎসীমার ওপর অবস্থান করতে পারে, যা সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।
উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নদীর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টের ৪৪টি জলকপাটই (স্লুইস গেট) খোলা রাখা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ডালিয়া পয়েন্টের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে নদীটির পানিপ্রবাহে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। শুক্রবার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৪১ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও, শনিবার সকালে তা ১৩ সেন্টিমিটারে এবং বিকেলে ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। পানি বৃদ্ধির এই দ্রুত গতির কারণে লালমনিরহাটের বিভিন্ন উপজেলার চরাঞ্চল ও নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। আবাদি জমি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় প্রান্তিক চাষিরা।
অন্যদিকে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগেও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সিলেটে কয়েক দিন ধরেই মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শনিবার সকাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ১৪০ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের অন্যতম। এছাড়া শনিবার দুপুর পর্যন্ত আরও ৩৫ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে সিলেটের নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে অবস্থান করলেও ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি অঞ্চলে আগামী তিন দিন ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পানি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের কারণে আগামী তিন দিনের মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, মেঘালয় পার্বত্য অঞ্চলে অতিভারি বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেটের নিম্নাঞ্চল দ্রুত প্লাবিত হতে পারে। প্রশাসন ও স্থানীয় পাউবো কার্যালয় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশের সার্বিক বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের ওপর বর্ষার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। লঘুচাপের একটি বর্ধিতাংশ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর ফলে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম জানিয়েছেন, দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু অত্যন্ত সক্রিয় থাকায় এই বৃষ্টিপাত আরও অন্তত তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। বৃষ্টিপাতের সময় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া এবং বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
পাশাপাশি আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিনে দেশের ১০টি অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ী দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এসব অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের এই যৌথ প্রভাবে দেশের কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী বাঁধগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।


