বাসভাড়ায় নৈরাজ্য

বাসভাড়ায় নৈরাজ্য

যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়ার দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। মহানগরী এলাকার বর্ধিত ভাড়া ২ টাকা ৫০ পয়সা করে হিসাব করলে এই রুটের ভাড়া আসে ৮৭ দশমিক ৫০ পয়সা। কিন্তু এই রুটের বিভিন্ন পরিবহন আগে থেকেই যাত্রীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারের বাসভাড়া বৃদ্ধির পর এই রুটের বাসগুলো তাদের ভাড়া আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ ১৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে। কল্যাণপুর থেকে ফার্মগেটের রুটে আগে থেকেই যাত্রীদের কাছ থেকে ১৫ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হতো। এই রুটের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার। সরকারি হিসাবে ভাড়া আসে সাড়ে ১২ টাকা। কিন্তু এই রুটের প্রতিটি পরিবহনে ২০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

যাত্রীরা একে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসাবে আখ্যায়িত করছেন। শুধু এই দুটি রুটই নয়, প্রায় সব রুটেই গণপরিবহনের নৈরাজ্যে অসহায় হয়ে পড়েছে যাত্রীরা। এমনকি সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া নিতে দেখা গেছে। সিএনজিচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগে বনশ্রী পরিবহনের একটি বাস ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়। তা ছাড়া রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপনে সর্বনিম্ন ভাড়া বাড়ানো হয়নি। মহানগরীতে বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া আগের মতোই ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা রাখা হয়েছে। কিন্তু রোববার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পরিবহনে ১৫ এবং ২০ টাকা করে সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে শনিবার বিকালে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বিআরটিএ’র এক বৈঠক থেকে জানানো হয় রোববার থেকে বাড়তি ভাড়া কার্যকর করা হবে। রোববার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া পুনঃনির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ভাড়া যথাক্রমে ১০ টাকা এবং ৮ টাকা ধার্য করা হয়েছে।’ এর আগে গত নভেম্বর মাসে তেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর পর ঢাকায় কিলোমিটার প্রতি ৫৫ পয়সা আর দূরপাল্লায় বাড়ানো হয় ৩৮ পয়সা। সে সময় সর্বনিম্ন ভাড়া মহানগরে ১০ টাকা আর দূরপাল্লায় ঠিক করা হয় ৮ টাকা।

রোববার জারি প্রজ্ঞাপনে মহানগর এলাকায় কিলোমিটার প্রতি ৩৫ পয়সা আর দূরপাল্লায় ৪০ পয়সা বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ৫২ আসনে দূরপাল্লায় বাসভাড়া কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ২০ পয়সা এবং এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে কিলোমিটার প্রতি হবে ২ টাকা ৫০ পয়সা।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন জেলা নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলায় চলাচলকারী বাসের ভাড়া হবে কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ৪০ পয়সা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনে এ ভাড়া বৃদ্ধি করে সরকার।

সরকারের নির্দেশ কার্যকর করতে এবং গণপরিবহনে নানা অনিয়ম রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা সরকারের নির্দেশ ও মোবাইল কোর্টের তোয়াক্কা না করেই ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে। রোববার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

রোববার সকালে রাজধানীর গুলিস্তান, ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাব, মিরপুর রোড, মহাখালী, বনানী, মগবাজার এলাকায় বাস না পেয়ে যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। মাঝেমধ্যে দুয়েকটি বাস এলেও আগে থেকেই যাত্রীতে পূর্ণ ছিল। গাদাগাদি করে হলেও কোনো রকম গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করেন তারা। এতে যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে।

পরিবহনগুলোতে বর্ধিত মূল্যের কোনো চার্টও টাঙানো হয়নি। গণপরিবহন সঙ্কট ও নৈরাজ্যে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। যাত্রীদের অভিযোগ, বাস মালিকরা ইচ্ছা করে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেন, যাতে বাড়তি ভাড়া আদায় করা যায়। আগে থেকেই যারা বাড়তি ভাড়া নিত তারা আবার কীভাবে ভাড়া বৃদ্ধি করে তা নিয়েও প্রশ্ন তাদের।

মগবাজার এলাকায় ইসরাত জাহান জানান, ব্যক্তিগত কাজে পল্টন যাবেন। রোববার সকালে আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো গাড়ি পাননি। এরপর দুটি বাস এলেও যাত্রীদের এমন ভিড় ছিল, যে তিনি উঠতেই পারেননি। এমন চিত্র দেখা গেছে ফার্মগেটেও। এখানে মানুষের চাপে বেশিরভাগ নারী ও বৃদ্ধরা পরিবহনে উঠতে পারেননি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেছেন, রাজধানীতে পরিবহনের কোনো সঙ্কট নেই। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সড়কে বাসের সংখ্যা কিছুটা কম থাকতে পারে, অন্য কোনো কারণ থাকার কথা না। অন্যদিকে আগে থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করা বাসগুলোও ফের ভাড়া বাড়িয়েছে। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হলেও বাড়তি ভাড়া আদায় করেই ছাড়ছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

গুগুল ম্যাপে দেখা যায়, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গাজীপুর চৌরাস্তার দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার। মহানগরীর ২ টাকা ৫০ পয়সা হিসাবে ভাড়া আসে ৬৫ টাকা। কিন্তু এ রুটে ৮০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বলাকা পরিবহনের যাত্রী রুহুল আমিন জানান, দুদিন আগেও গাজীপুর থেকে ঢাকার ভাড়া ছিল ৫০ টাকা। কিন্তু এখন গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে মহাখালী পর্যন্ত ৮০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

কুড়িল থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। নতুন নির্ধারিত চার্ট অনুযায়ী এ দূরত্বের ভাড়া আসে ৪০ টাকা। এ পথে চলাচলকারী স্মার্ট উইনার পরিবহনের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা করে। মৌমিতা পরিবহনের বাস সাভার থেকে আজিমপুর পর্যন্ত ভাড়া আগে ছিল ৫০ টাকা। এ পথের দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার, ভাড়া আসে ৫৮ টাকা। যাত্রীদের কাছ থেকে ৬৫ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।

পল্টন এলাকায় আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি মহাখালী থেকে তার কর্মস্থল পল্টনে আসেন। মনজিলসহ বেশ কয়েকটি পরিবহন আগে থেকেই ওয়েবিলের ফাঁদে ২০ টাকা করে ভাড়া নিত। এখন ৩০ টাকা করে নিচ্ছে। গুগুল ম্যাপে দেখা যায় এ রুটের দূরত্ব ৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার। সে হিসাবে ভাড়া আসে ১৬ টাকা ৫০ পয়সা।

অন্যদিকে ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি রোধে সরকারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি নতুন করে ভাড়া নির্ধারণের দাবিও জানানো হয়। রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গত নভেম্বরে জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর সময়ে বাসভাড়া ৩৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছে। এর ৯ মাসের মাথায় আবারও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সঠিক ব্যয় বিশ্লেষণ ছাড়া একলাফে বাসভাড়া আবারও ২২ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়। প্রতিটি পুরনো লক্কর-ঝক্কর বাসকে শোরুম থেকে নামানো নতুন বাসের দাম, ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য নতুন বাসের সুযোগ-সুবিধার হিসাব ধরে ব্যয় বিশ্লেষণ করা হলেও সিটি সার্ভিসে ৯৮ শতাংশ বাস-মিনিবাস চলাচলের অযোগ্য। আন্তঃজেলা দূরপাল্লার ৪৮ শতাংশ বাস ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। এসব বাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পুরনো এসব বাসের যাত্রীসেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তিনি আরও বলেন, সরকার বাসমালিকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করলেও কোনো বাসে সরকারনির্ধারিত ভাড়া কার্যকর নেই। সরকারনির্ধারিত ভাড়ার বেশ কয়েকগুণ বর্ধিত ভাড়া বাসে বাসে আদায় হলেও সরকার কার্যত এসব বাসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। সিটি সার্ভিসে সরকার কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করলেও বাসে বাসে ওয়েবিলে যাত্রীর মাথা গুণে গুণে ভাড়া আদায় করা হয়। ঢাকা মহানগরীর কথিত সিটিং সার্ভিসে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত করলেও সর্বশেষ গন্তব্য পর্যন্ত ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।

বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে সরকারের উদ্যোগ নেই। এটি পরিবহন মালিকরাই নিয়ন্ত্রণ করেন। যাত্রীদের জিম্মি করে বছরের পর বছর এই বাড়তি ভাড়া নেওয়া দুঃখজনক।

এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে বিআরটির পরিচালক মাহবুব-ই-রাব্বানীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে বাড়তি ভাড়া আদায় ও বিভিন্ন অনিয়ম ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে বিআরটিএ।

রোববার বিআরটিএ পরিচালিত মোবাইল কোর্ট অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অপরাধে ১৫টি মামলায় ৩২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। একই সঙ্গে বনশ্রী পরিবহনের একটি গাড়িকে সিএনজিচালিত হওয়া সত্ত্বেও ডিজেলচালিত বলে ভাড়া নেওয়ার অপরাধে ডাম্পিং করা হয়েছে।

এ ছাড়া রুট ভায়োলেশন, রুট পারমিটবিহীন, হাইড্রোলিক হর্ন ও ফিটনেসবিহীনসহ অন্যান্য অপরাধের দায়ে ৯৩টি মামলায় মোট ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে সংস্থাটি। এ সময় ২টি গাড়ি ডাম্পিং এবং ২ দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে বিআরটিএ।

প্রসঙ্গত কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গত শুক্রবার রাত ১২টার পর ডিজেল, পেট্রোল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলে ৩৪ টাকা, কেরোসিনে ৩৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা ও পেট্রোলে বাড়ানো হয়েছে ৪৪ টাকা। ভোক্তা পর্যায়ে আগে খুচরামূল্য ছিল প্রতি লিটার ডিজেল ৮০ টাকা, কেরোসিন ৮০ টাকা, অকটেন ৮৯ টাকা ও পেট্রোল ৮৬ টাকা। বর্ধিত দামে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৪ টাকা, কেরোসিন ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ টাকা ও পেট্রোল ১৩০ টাকা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়েছে সরকার।

জাতীয়