জাতীয় ডেস্ক
প্রতি বছর ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে দিনটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালনের তালিকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের ‘ক’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সংশোধিত পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দিবসটি পালনের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও আনুষ্ঠানিক গুরুত্ব নিশ্চিত করা হলো।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা নতুন পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, প্রতি বছর ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হবে। গত ১১ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক দিবস পালন সংক্রান্ত যে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল, নতুন এই সিদ্ধান্তটি সেখানে ‘ক’ শ্রেণির তালিকায় যথাস্থানে সন্নিবেশিত বলে গণ্য হবে। যথাযথভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য দেশের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
এর আগে গত ১১ মার্চ সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালনের যে সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেখানে ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ দিবস বা কর্মসূচির উল্লেখ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির বাইরে থাকা এই দিবসটিকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে জাতীয় দিবস পালনের কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে এই দিবসের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছিল না এবং দিবসটি পালন থেকে বিরত থাকা হতো।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত সিপাহী-জনতা বিপ্লবের স্মরণে এই দিবসটি পালন করা হয়। ওই বছরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান ঘটে এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। পরবর্তীতে ৭ নভেম্বর কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান তথা সিপাহী-জনতা বিপ্লব সংঘটিত হলে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। এই ঘটনার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালীন ৭ নভেম্বরকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালন করত।
তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিতর্কিত ও আলোচিত অধ্যায়। এই দিবসের সমালোচক ও বিরোধী পক্ষ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এই দিনটিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকে। তাদের দাবি, ওই দিনটির প্রেক্ষাপটে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাকর্মকর্তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার এবং নাজমুল হুদার মতো বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও সমমনা সংগঠনগুলো এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
বর্তমান সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ৭ নভেম্বর পালন নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে এখন থেকে এই দিনে রাষ্ট্রীয়ভাবে সভা-সেমিনার ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি পালিত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই পদক্ষেপ জাতীয় দিবস পালনের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে এসে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর রাষ্ট্রীয় পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল বিভাগকে এই পরিপত্র অনুসরণ করে আগামী ৭ নভেম্বর উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


