আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ অবরোধ সত্ত্বেও দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানের কৃষিমন্ত্রী গোলামরেজা নুরি। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বিকল্প সীমান্ত পথ ব্যবহারের সক্ষমতার কারণে এই অবরোধ দেশটির খাদ্য সরবরাহে বড় কোনো সংকট তৈরি করতে পারেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবার রাজধানী তেহরানে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিবৃতিতে কৃষিমন্ত্রী গোলামরেজা নুরি বলেন, মার্কিন নৌ অবরোধের ফলে ইরানের সাধারণ জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও মৌলিক পণ্য সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তিনি জানান, ইরানের বিশাল ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে থাকা স্থল সীমান্ত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। ফলে সমুদ্রপথে সীমাবদ্ধতা থাকলেও স্থলপথ ব্যবহার করে জরুরি পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হচ্ছে দেশটির অভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপাদন। বর্তমানে ইরানের প্রয়োজনীয় কৃষি পণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রায় ৮৫ শতাংশই দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত হচ্ছে। এই উচ্চমাত্রার স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিদেশি চাপ বা অবরোধের মুখে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের এই দাবি অনুযায়ী, আমদানির ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক কম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট শুরু হয় গত ১৩ এপ্রিল থেকে। ইরানের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণার মাত্র কয়েকদিন পরই যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় নৌ অবরোধ আরোপ করে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের ফলে ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং তেল বহির্ভূত রপ্তানি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে তেহরান শুরু থেকেই এই অবরোধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নৌ অবরোধ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল সামুদ্রিক পথ রুদ্ধ করে ইরানের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু কৃষিমন্ত্রীর এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান আগে থেকেই সম্ভাব্য অবরোধের কথা মাথায় রেখে তাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের ওপর জোর দিয়েছিল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ইরানের যে স্থল যোগাযোগ রয়েছে, তা এই সংকটের সময় লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদী নৌ অবরোধের ফলে কিছু শিল্পজাত পণ্য ও নির্দিষ্ট কিছু আমদানিকৃত কাঁচামালের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও খাদ্য ও কৃষিপণ্যে ইরান স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করছে, তবুও আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দামের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিরতির পর এ ধরনের অবরোধ কূটনৈতিক আলোচনার পথকে সংকুচিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায়, তেহরান তাদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে এই চাপ মোকাবিলা করে কতটা সফল হয়, তা সামনের দিনগুলোতে দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে।
ইরান সরকার স্পষ্ট করেছে যে, তারা তাদের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর এবং যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা সামরিক চাপের মুখে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে বিকল্প পথসমূহ সক্রিয় রাখবে। মার্কিন এই অবরোধের বিপরীতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী অবস্থান নেয়, সেটিও এখন দেখার বিষয়।


