আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি সহায়তা চুক্তির বাস্তবায়নে বড় ধরনের নতুন কূটনৈতিক শর্ত আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া এগিয়ে না নেয়, তবে এই বহু বিলিয়ন ডলারের বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি অনুমোদন পাবে না।
ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে বহুল আলোচিত দ্বিপক্ষীয় পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। এক বিবৃতিতে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ ও রিয়াদের মধ্যে প্রস্তাবিত পারমাণবিক কর্মসূচির চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পূর্ণভাবে সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করেন, এই চুক্তির আওতায় সৌদি ভূখণ্ডে কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হবে না। কর্মসূচিটি পুরোপুরি অসামরিক, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রক ও সৌদি সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তিটি মূলত ‘১২৩ চুক্তি’ নামে পরিচিত, যা এখন পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে উপস্থাপন করা হয়েছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের কাছে নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তরের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আইনসভার অনুমোদন আবশ্যক। ওয়াশিংটন এই চুক্তিকে উভয় দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক জোরদারের একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে পারমাণবিক সহযোগিতাকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর থেকেই সৌদি আরবকে এই জোটে আনার জন্য ওয়াশিংটন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে।
তবে এই নতুন শর্তের বিপরীতে রিয়াদের অবস্থান সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘদিনের স্পষ্ট। সৌদি আরব বারবার ঘোষণা দিয়ে আসছে যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌমিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্পষ্ট এবং নিশ্চিত রোডম্যাপ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে না। অন্যদিকে, ইসরায়েলের বর্তমান সরকার ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রনীতির কঠোর বিরোধিতা করে আসছে, যা পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াকে নতুন করে জটিলতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সৌদি আরব তাদের জাতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তর কৌশল ‘ভিশন ২০৩০’-এর অধীনে তেল-নির্ভরশীলতা হ্রাস করে টেকসই ও নবায়নযোগ্য শক্তি অর্জনে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে মার্কিন উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষতার অন্তর্ভুক্তি সৌদি অসামরিক জ্বালানি খাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করবে বলে মনে করা হচ্ছিল। তবে ঘরোয়া রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে রিয়াদ কীভাবে এই মার্কিন শর্তের মোকাবিলা করে, সেদিকেই নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।
আমেরিকান কংগ্রেসে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে সৌদি নীতি নির্ধারণী মহলের প্রতিক্রিয়া আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিক নির্দেশ করবে।


