জাতীয় ও কূটনৈতিক ডেস্ক
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবারের কল্যাণ এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। বৈঠকে ইতিহাস সংরক্ষণ ও ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গঠনে মার্কিন সরকারের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আজ রাজধানীতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দীন আহমেদ এবং যুগ্মসচিব মো. জেহাদ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রে অ্যান্ড মিডিয়া অফিসার রিকি সালমিনা, প্রোটোকল অ্যাসিস্ট্যান্ট সাদ বিন এলাহী এবং নোট টেকার জোশ পোপ।
বৈঠকের শুরুতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আলোচনার সূচনাতেই মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, স্মৃতি ও আদর্শ সমুন্নত রাখাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের অগ্রগতি মার্কিন প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হয়। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) তত্ত্বাবধানে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে একটি যাচাইকৃত নিরপেক্ষ তালিকা চূড়ান্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে বলে বৈঠককে অবহিত করা হয়।
একইসঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ও শহীদদের স্মরণে এবং তাঁদের পরিবারের কল্যাণে গঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চিত্র উপস্থাপন করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নবগঠিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর’-এর অধীনে ইতিমধ্যে ৮৪৩ জন শহীদ এবং ১৫ হাজার ৩০ জন আহত ব্যক্তির বিস্তারিত ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়েছে। শহীদ পরিবারের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকার অনুদান ও প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
আহতদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ক্যাটাগরিভিত্তিক সহায়তার বিধান রাখা হয়েছে। আঘাতের তীব্রতা অনুযায়ী ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণিভুক্ত করে যথাক্রমে ৫ লাখ, ৩ লাখ এবং ১ লাখ টাকা এককালীন অর্থসহ নির্ধারিত মাসিক ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকায় এ পর্যন্ত ১৫৪ জন সংকটাপন্ন আহত ব্যক্তিকে সরকারি অর্থায়নে থাইল্যান্ড, তুরস্ক ও রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই পুনর্বাসন ও চিকিৎসা সহায়তার বিপরীতে মোট ৪৪৮ কোটি ১১ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন সরকারের এই ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি এবং আহতদের পুনর্বাসন কর্মসূচির ইতিবাচক মূল্যায়ন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইতিহাস সংরক্ষণ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘ন্যাশনাল আর্কাইভস’ এবং ‘স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন’-এর প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঠিক নথি সংরক্ষণে মার্কিন পাবলিক ডিপ্লোমেসি টিম প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রযুক্তি বিনিময়ে প্রস্তুত রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকের শেষে মন্ত্রী আহমেদ আযম খান মার্কিন রাষ্ট্রদূতের হাতে বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ—‘প্রেসিডেন্ট জিয়া: রাজনৈতিক জীবনী’ এবং ‘বেগম খালেদা জিয়া: দ্য লাইফ অ্যান্ড স্টোরি’সহ বেশ কিছু মেমোরেবিলিটি ও স্মারক উপহার হিসেবে তুলে দেন।


