পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ফেরদৌসি শাহরিয়ারের প্রয়াণ

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ফেরদৌসি শাহরিয়ারের প্রয়াণ

কূটনৈতিক ডেস্ক

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও দেশের অভিজ্ঞ পেশাদার কূটনীতিক ফেরদৌসি শাহরিয়ার মারা গেছেন। বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর।

পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিগত কিছুদিন ধরে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। সম্প্রতি শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখা দিলে তাঁকে শ্যামলীর ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থাতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর এই আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুতে দেশীয় কূটনৈতিক অঙ্গন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ফেরদৌসি শাহরিয়ার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সার্ভিসের একজন অত্যন্ত দক্ষ, বিচক্ষণ ও প্রতিশ্রুতিশীল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি বিসিএস (পররাষ্ট্র বিষয়ক) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সহকারী সচিব পদে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবনের সূচনা করেন। সুদীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময়ের কর্মজীবনে তিনি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় অঙ্গনেই সততা, নিষ্ঠা ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

কূটনৈতিক কর্মজীবনে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের বাংলাদেশ মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্কক, ইতালির রোম, যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে নিয়োজিত ছিলেন। এসব মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বহুপাক্ষিক কূটনীতি বিকাশ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর দ্রুত সেবা প্রদান নিশ্চিতকরণে তিনি অনন্য দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়ন ও বৈশ্বিক দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে তিনি সুনির্দিষ্ট অবদান রাখেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের মিশন প্রধান হিসেবে তাঁর কার্যকাল ছিল অত্যন্ত সফল ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ সময় দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা, কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়ানো এবং শ্রমবাজার সংক্রান্ত সহযোগিতায় তিনি কার্যকর ভূমিকা নেন। তাঁর দূরদর্শী কূটনৈতিক উদ্যোগ ঢাকা ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বিদেশে মিশন পরিচালনার পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী বিভাগে তিনি কাজ করেছেন। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ের কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। একই সাথে জুনিয়র কূটনীতিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে তাঁর গঠনমূলক ভূমিকা সর্বজনবিদিত।

পেশাগত অঙ্গনে সততা, মেধা ও মানবিক গুণাবলির জন্য তিনি সহকর্মী ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে সমাদৃত ছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সেবা খাতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

রাষ্ট্রদূত ফেরদৌসি শাহরিয়ারের মৃত্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, পররাষ্ট্রসচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তাঁরা উল্লেখ করেন, ফেরদৌসি শাহরিয়ারের মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ ও দক্ষ কূটনীতিকের চলে যাওয়া দেশের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এক বড় শূন্যতা। সরকারি দায়িত্ব পালনে তাঁর সততা ও একাগ্রতা তরুণ কর্মকর্তাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। তারা মরহুমার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

মন্ত্রণালয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রয়াতের দাফন ও শেষ আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কিত বিষয়াবলী পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মরহুমের স্মরণে প্রয়োজনীয় শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও শোক সভা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ