অপরাধ ও বিচার ডেস্ক
ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে চট্টগ্রামের আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে তার তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার করেছে যশোর জেলা পুলিশ। বুধবার (২৮ মে) ভোর পৌনে ৪টার দিকে যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকায় ঢাকা-যশোর মহাসড়কে বসানো বিশেষ চেকপোস্ট থেকে তাদের আটক করা হয়। পরবর্তীতে সকাল ১০টার দিকে তাদের চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. মিরাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চট্টগ্রাম পুলিশের সুনির্দিষ্ট রিকুইজিশন এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোর ডিবি পুলিশ ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের ৯টি টিম যৌথভাবে ঝুমঝুমপুর এলাকায় অবস্থান নেয়। সেখানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানোর সময় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও তার তিন সঙ্গীকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটকরা স্বীকার করেছেন, আইনি প্রক্রিয়ার হাত থেকে বাঁচতে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আত্মগোপনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যশোরে এসেছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা মো. মুসার ছেলে ডেভিড ইমন। একসময় সাধারণ জীবনযাপন করলেও পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দেন। দ্রুতই তিনি নগরীর অপরাধ জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন এবং একপর্যায়ে সাজ্জাদ গ্রুপের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারী ও বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি ছড়িয়ে পড়লে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে আইনি পদক্ষেপ এড়াতে তিনি সাময়িকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাইয়ে অবস্থান নেন। সেখান থেকেও প্রবাসী ও চট্টগ্রামের স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের হোয়াটসঅ্যাপে কল করে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করতেন বলে পুলিশের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তার নির্দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে সশস্ত্র হামলা ও গুলিবর্ষণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার এলাকায় ‘ডিডিএন’ নামক একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে চাঞ্চল্যকর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় নতুন করে ডেভিড ইমনের নাম প্রকাশ্যে আসে। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুলাই নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর কাছে সরাসরি ২ কোটি টাকা এককালীন এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত ১৩ জুলাই ১৫ থেকে ২০ জনের একটি একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী ডিডিএন কার্যালয়ে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। সন্ত্রাসীরা অফিসের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে আনুমানিক ১৫ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করে। একই সঙ্গে কর্মচারীদের বেতনের জন্য সংরক্ষিত প্রায় ৩৫ লাখ টাকা, ড্রয়ারের নগদ ৪৭ হাজার টাকা এবং দামি মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যায়।
ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ও নিয়মিত মামলার ভিত্তিতে র্যাব এবং পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের ২০ জন সদস্যকে আটক করে। এ বিষয়ে পূর্বে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সল আহম্মেদ জানিয়েছিলেন, প্রযুক্তিগত সহায়তায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের অবস্থান শনাক্ত করে তাকে গ্রেফতারের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় যশোর থেকে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হলো।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের কাছে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি একটি বড় আতঙ্কের নাম ছিল। দুবাই থেকে কল করে চাঁদা দাবি ও পরবর্তীতে স্থানীয় ক্যাডারদের দিয়ে হামলা চালানোর ধরন চট্টগ্রামে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছিল। যশোরের এই সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে সীমান্তবর্তী রুট ব্যবহার করে চিহ্নিত অপরাধীদের দেশত্যাগের প্রবণতা রোধে পুলিশের সজাগ দৃষ্টির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে শীর্ষ এই সন্ত্রাসীর গ্রেফতারের ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মনে স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।


