কওমি মাদরাসায় নজরদারি বাড়াতে আল-হাইআতুল উলয়ার হটলাইন ও বিশেষ সেল গঠন

কওমি মাদরাসায় নজরদারি বাড়াতে আল-হাইআতুল উলয়ার হটলাইন ও বিশেষ সেল গঠন

জাতীয় ডেস্ক

কওমি মাদরাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা জোরদার, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ এবং যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তি দূর করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলোর সর্বোচ্চ সংস্থা ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’। কওমি মাদরাসাসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই (ফ্যাক্ট চেকিং), অভিযোগ গ্রহণ এবং তদারকি কার্যক্রম শক্তিশালী করতে একটি কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’ গঠন করা হয়েছে। একই সাথে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগের সুবিধার্থে বিশেষ হটলাইন সেবা এবং আইনি সহায়তা প্রদানে একটি শক্তিশালী লিগ্যাল প্যানেল গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছে।

রাজধানীর আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত ‘কওমি মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার রোধ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আল-হাইআতুল উলয়ার করণীয়’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান মাওলানা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশক্রমে আয়োজিত এই সভায় সংস্থাটির অধীনস্থ ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে সভাপতিত্ব করেন আল-হাইআতুল উলয়ার কো-চেয়ারম্যান ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা সাজিদুর রহমান।

সভায় দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বক্তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অপরাধ, অনিয়ম বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে তার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া আবশ্যক। অপরাধী ব্যক্তি বা অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কোনো অবস্থাতেই সাংগঠনিক বা নৈতিক প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করাই কাম্য।

একই সাথে নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত অপরাধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে একপক্ষীয়ভাবে চিহ্নিত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। কওমি মাদরাসাগুলো ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ চর্চা, মানবিক চরিত্র গঠন এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং তথ্যের সঠিকতা বিচারে আল-হাইআতুল উলয়ার পক্ষ থেকে একটি বিশেষ হটলাইন (০১৭০০-৭৬৩১৭৮) চালু করা হয়েছে। এই হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে সাধারণ নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেকোনো কওমি মাদরাসাসংক্রান্ত অভিযোগ, তথ্য-উপাত্ত, কিংবা সন্দেহজনক তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য লিখিত বার্তা, ভয়েস কল, ছবি, ভিডিও এবং প্রয়োজনীয় নথি পাঠাতে পারবেন।

প্রশাসনিক ও তদারকি সক্ষমতা বাড়াতে গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্যের কেন্দ্রীয় ‘কওমি মাদরাসা পর্যবেক্ষণ সেল’। এতে শীর্ষস্থানীয় আলেম ও শিক্ষাবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মাওলানা সাজিদুর রহমান, মাওলানা মুফতি রুহুল আমীন, মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, মাওলানা আব্দুল বছীর, মাওলানা মুফতি এনামুল হক, মাওলানা একরাম হোসাইন ওয়াদুদী, মাওলানা মুহসিন শরীফ এবং মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আলী।

কেন্দ্রীয় এই সেলের পাশাপাশি আল-হাইআতুল উলয়ার অধীনস্থ প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডকে তাদের নিজ নিজ অধিভুক্ত মাদরাসাগুলোর নিয়মিত কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য পৃথক ‘মাদরাসা মনিটরিং সেল’ গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ে মাদরাসা পরিদর্শন ও তদারকি ব্যবস্থা আরও নিবিড় ও কার্যকর হবে।

এ ছাড়া কওমি মাদরাসাসংক্রান্ত যেকোনো প্রশাসনিক বা সামাজিক জটিলতায় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি ‘লিগ্যাল প্যানেল’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্যানেল যেকোনো আইনি সহায়তার পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপে সংস্থাকে পরামর্শ দেবে।

সভা থেকে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, যেকোনো সংবাদ বা তথ্য প্রচারের আগে যেন তা সঠিক সূত্র থেকে যাচাই করে নেওয়া হয়। দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু তথ্যপ্রবাহ বজায় রাখতে গণমাধ্যমের সহায়তার ওপর জোর দেন উপস্থিত নেতৃবৃন্দ। উচ্চপর্যায়ের এই সভায় আল-হাইআতুল উলয়ার অফিস ব্যবস্থাপক মাওলানা মো. অছিউর রহমানসহ অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ