জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধসহ ইতিহাসের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক ত্যাগ ও রক্তের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদকেই দেশের রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। রাজনীতিকে রাজপথে বা সংসদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার যেকোনো কৃত্রিম প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক চর্চাকে সংসদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ২য় বর্ষপূর্তি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) যৌথ উদ্যোগে এই আলোচনা সভাটি আয়োজিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী দেশের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও যখন এ দেশের মানুষকে মৌলিক ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়, তখন তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও আত্মপর্যালোচনার দাবি রাখে। দীর্ঘ আন্দোলন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত ভোটাধিকারের মাধ্যমে জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট দিয়েছে এবং তার ভিত্তিতেই বর্তমান সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার পরিচালনা করছে।
তবে এই অর্জনের পরও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কিছু নেতিবাচক দিক নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে গণতন্ত্র ও সংসদীয় ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, তাকে পাশ কাটিয়ে রাজনীতিকে সংসদের বাইরে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে মহিমান্বিত করা এবং সংসদের ভেতরে সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবেশ বজায় রাখাই বর্তমান সময়ে সব রাজনৈতিক দলের জন্য প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে অশালীনতা ও ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী জানান, জুলাই সনদে যে সংস্কার ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, তা বাস্তবায়নে সরকার সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ। দলীয় নেতৃত্বের দিকনির্দেশনায় নির্বাচিত এই সংসদই হবে সেই পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ বিচার বিভাগ নিশ্চিতকরণ, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং তরুণ সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেই এই মুহূর্তে সরকার সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
রাজনীতিতে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি স্পষ্ট করেন যে, অতীতে যেভাবে রাজপথে থেকে সুশাসন ও ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল, তেমনিভাবে সরকারে থাকা অবস্থাতেও প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যরা সুশাসন নিশ্চিতে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। গণতান্ত্রিক সকল শক্তির সুসংহত ঐক্য এবং সংসদীয় ব্যবস্থার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই শহীদদের মহান আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
আলোচনা সভায় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের বিভিন্ন দিক নিয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেন।


