আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার পেছনে প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে কোনো ধরনের মতবিরোধ বা কূটনৈতিক দূরত্ব দায়ী নয় বলে স্পষ্ট করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাজধানী তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ অবরুদ্ধ হওয়ার প্রধান কারণ হলো এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক তৎপরতা ও হামলা।
বাঘাই জানান, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ওমানের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। বিগত সাত থেকে আট দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে বেশ কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। দুই দেশের সমঝোতার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ও নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণের চেষ্টা চলছে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং রুটের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে ওমানের সঙ্গে নৌপথ সম্পর্কিত সমঝোতা বাস্তবায়িত হলেও তা প্রণালীটি স্থায়ীভাবে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন বাঘাই। তিনি উল্লেখ করেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পূর্বের মতো স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু করার পূর্বশর্ত হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের আগ্রাসী সামরিক কার্যক্রম এবং জলসীমায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের অবসান ঘটানো।
মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওমান ও ইরানের যৌথ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালীর এক পাশে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান অবস্থিত হওয়ায় এই প্রণালীর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সমন্বিত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান আঞ্চলিক ও বহিরাগত বিভিন্ন অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখলেও এই সংকটের মূল সমাধানের জন্য মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ হওয়াকে অপরিহার্য বলে মনে করছে।
উল্লেখ্য, বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালীকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত খনিজ তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই সংবেদনশীল প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়। ফলে এই প্রণালীতে সাময়িক অবরোধ বা অচলাবস্থা তৈরি হলে তা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হয় গভীর সংকট, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে এশিয়া ও ইউরোপসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ওমানের আলোচনা যদি একটি কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারে, তবে তা সাময়িকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই জলপথকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখতে হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।


