দেশের বাজারে আবারও বাড়ল সোনার দাম: ভরিতে ১ হাজার ১০৮ টাকা বৃদ্ধি

দেশের বাজারে আবারও বাড়ল সোনার দাম: ভরিতে ১ হাজার ১০৮ টাকা বৃদ্ধি

অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা বিশুদ্ধ সোনার দর বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশের বাজারে আবারও বাড়ানো হয়েছে সোনার দাম। এবার ভরিতে ১ হাজার ১০৮ টাকা বাড়িয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ টাকা। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নির্ধারিত এই নতুন দর মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে সারা দেশের সকল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে একযোগে কার্যকর করা হয়েছে।
বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দেশের সার্বিক বাজার পরিস্থিতি, স্থানীয় বাজারে কাঁচামাল তথা তেজাবি সোনার মূল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারের সূচক পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বাজুস প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নতুন নির্ধারিত মূল্য সূচি অনুযায়ী ভ্যাটসহ দেশের বাজারে সর্বস্তরের সোনার দর পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত এই নতুন দর অপরিবর্তিত ও কার্যকর থাকবে।
নতুন দরপত্র অনুযায়ী, ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২১ ক্যারেট সোনার দাম ১ হাজার ৪৯ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ২৪ হাজার ৫ ৯০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ৯৩৩ টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৪ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ৭০০ টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫ ২২ টাকা করা হয়েছে। এর আগে গত ৮ আগস্ট দেশের বাজারে সোনার দাম সামঞ্জস্য করেছিল বাজুস, যেখানে ভরিতে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরির দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পুনরায় এই দর বৃদ্ধি দেশের খুচরা গহনার বাজারে নতুন করে প্রভাব ফেলছে।
বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনৈতিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি রোধে বিশ্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে বিশ্বজুড়ে সোনার দরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ মূলত কাঁচামাল হিসেবে স্থানীয় তেজাবি সোনার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় দর বৃদ্ধির প্রভাব খুচরা বাজারে এসে পড়ে। ফলে জুয়েলারি খাতকে নিয়মিত ব্যবধানে স্থানীয় বাজারের দর সামঞ্জস্য করতে হচ্ছে। চলতি বছরেই দেশের বাজারে সোনার দর বহুবার সমন্বয় করা হয়েছে, যা দেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারায় উল্লেখযোগ্য একটি রেকর্ড।
সোনার দামের এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতির ফলে খুচরা জুয়েলারি ব্যবসা এবং সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে এর বহুমুখী প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো, যারা সামাজিক অনুষ্ঠান বা পারিবারিক আয়োজনের জন্য সোনার অলংকার কেনাকাটা করেন, তারা বাজেট সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ছেন। উচ্চ মূল্যের কারণে সাধারণ ক্রেতারা তাদের গহনা ক্রয়ের ওজন বা পরিমাণ লক্ষণীয়ভাবে কমিয়ে আনছেন। অনেকেই ২২ ক্যারেটের অলংকরণের পরিবর্তে ২১ ক্যারেট বা ১৮ ক্যারেটের কম ওজনের হালকা নকশার গহনা ক্রয়ের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে খুচরা জুয়েলারি দোকানগুলোতে সার্বিক অলংকার বিক্রির হার হ্রাস পেয়ে একধরনের ব্যবসায়িক স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, দেশের জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নির্ধারিত মূল্যের মধ্যেই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট যুক্ত থাকায় ক্রেতাদের কাছ থেকে আলাদা করে কোনো অতিরিক্ত ভ্যাট আদায় করার বিধান নেই। তবে অলংকারের কারুকাজ, প্রস্তুতপ্রণালী এবং নকশার ওপর ভিত্তি করে জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব মজুরি হার নির্ধারণ করে থাকে। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জানান, একদিকে কাঁচামালের উচ্চ মূল্য, অন্যদিকে বিক্রি হ্রাস পাওয়ার কারণে জুয়েলারি কারিগর ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বহন করা ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় কাঁচামালের জোগান স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় বাজারে সোনার দামের এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। জুয়েলারি শিল্পের টেকসই বিকাশ এবং সাধারণ ক্রেতাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাজার পর্যবেক্ষণ জোরদার করার পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতিমালার ওপর জোর দিচ্ছেন খাতের ব্যবসায়ীরা।
অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ