আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন/তেহরান — মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন নৌবাহিনীর শক্ত অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই সমুদ্রপথে বর্তমানে ইরানের কোনো কর্তৃত্ব নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তেহরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থা এখনো আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক সমঝোতার আওতাধীন।
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর কৌশলগত অবস্থান ও পদক্ষেপের ফলে অঞ্চলটির সার্বিক পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের অনুকূলে রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালি এখন পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরাই এটি তদারকি করছি, অন্য কেউ নয়।” ইরানের ভূমিকা ও সমঝোতার বিষয়ে নিজের আস্থাহীনতার কথা পুনর্ব্যক্ত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, “আমি ইরানকে বিশ্বাস করি না। ইরানের দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখার সুযোগ নেই। তবে বাস্তব বিষয় হলো, প্রণালিতে বর্তমানে তাদের কোনো প্রভাব নেই, এর পুরোটাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে।”
বিশ্বের মোট খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্যিকভাবে পরিবাহিত চালানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা হয়। ওমান ও পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ প্রণালিটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে বিবেচিত। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করার পর থেকে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। জবাবে ইরান প্রণালিতে বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং অননুমোদিত রুট ব্যবহারকারী জলযানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অভূতপূর্ব অস্থিরতা দেখা দেয় এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
প্রণালির চলমান সামরিক অচলাবস্থা নিরসনে সম্প্রতি ইরান ও প্রতিবেশী দেশ ওমানের মধ্যস্থতায় সমুদ্রপথ চালুর নতুন কূটনৈতিক ও কারিগরি উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে। দু’দেশের কূটনৈতিক সূত্রের তথ্যানুযায়ী, বাণিজ্য জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য যৌথ টহল ও তদারকির অধীনে নতুন একটি রুট উন্মুক্ত করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। পূর্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে ইরান ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি আপস করতে ইচ্ছুক। তবে তেহরান তা ভিত্তিহীন বলে খারিজ করে দেয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানায়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার সুবিধার্থে তারা কোনো তৃতীয় পক্ষ ব্যতিরেকে প্রতিবেশী দেশ ওমানের সাথেই প্রয়োজনীয় সমঝোতা সম্পন্ন করবে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন যে, কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এই জলপথটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করা আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যান্য শর্তাদি পূরণের ওপর নির্ভর করছে। নির্দিষ্ট কোনো পূর্বশর্ত সরাসরি প্রকাশ না করলেও ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাস এবং বাণিজ্য অবরোধ প্রত্যাহার না হলে হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি এবং ইরানের অটল অবস্থানের ফলে আন্তর্জাতিক নৌপথটিতে স্বল্পমেয়াদে অনিশ্চয়তা ও সামরিক উত্তেজনা বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।


