অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বরগুনার তালতলী উপজেলায়। উপজেলার একটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সফলভাবে সম্পন্ন করার পর বেঁচে যাওয়া ২২ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৯ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে সাধারণত বাজেট বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত ব্যয়ের আবেদন করার প্রবণতা দেখা গেলেও, নির্ধারিত কাজ শেষে উদ্বৃত্ত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার এই উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি’র (ইজিপিপি) আওতায় তালতলী উপজেলার দুটি গুরুত্বপূর্ণ খালের প্রায় ৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত ছিল উপজেলার বড়বগী ও বড় ভাইজোড়া খাল। ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা অনুমোদিত বাজেটের এই প্রকল্পটি বড়বগী ইউনিয়নের ছাতনপাড়া এলাকার মোশাররফ হোসেন খানের বাসভবন সংলগ্ন অংশ থেকে শুরু হয়ে খাজুরা কালভার্ট অতিক্রম করে ছোটবগী ইউনিয়নের বলের তবক এলাকার ওয়াজেদ কমিশনারের বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ তদারকি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় ২৯৭ জন নিবন্ধিত শ্রমিককে যুক্ত করা হয়। শ্রমিকদের নির্ধারিত মজুরি নিয়মমাফিক ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি পরিশোধ করা হয়। একই সাথে প্রকল্পের ভৌত অবকাঠামোগত কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত করা হয়। সমুদয় কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, নির্ধারিত লক্ষ্যের পুরো কাজ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও বরাদ্দকৃত মূল অর্থ থেকে ২২ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৯ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। পরবর্তীতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ব্যাংক চালানের (চালান নম্বর: ২৬২৭-০০০৮৫৬৯৮৬৩১) মাধ্যমে ওই অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সরকারি হিসাব খাত তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদান করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জানান, কাজের মান ধরে রেখে সঠিক তদারকি এবং অপচয় রোধ করার কারণেই এই বড় অংকের অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে। সরকারি অর্থের প্রতিটি পয়সার হিসাব নিশ্চিত করা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বজায় রাখাই ছিল প্রশাসনিক দলটির মূল লক্ষ্য।
এ বিষয়ে বরগুনার তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, জনগণের দেওয়া কর ও রাজস্বের টাকার সাশ্রয় এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারি কর্মকর্তার জন্য মৌলিক প্রশাসনিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় জনগণের সুবিধার্থে খালের পুনঃখনন কাজ নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী শেষ করা হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পে যে অর্থ উদ্বৃত্ত ছিল, তা নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রের তহবিলে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতে উপজেলার অন্যান্য সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সমপরিমাণ স্বচ্ছতা, ব্যয়সংকোচন ও নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখতে উপজেলা প্রশাসন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া বা অতিরিক্ত বরাদ্দের দাবির মতো অভিযোগ ওঠে। সেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে সরকারি কোষাগারে বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত পাঠানোর এই পদক্ষেপ স্থানীয় সরকার পরিচালনায় একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি তহবিলের সাশ্রয় ঘটেছে, অন্যদিকে উন্নয়ন বাজেটের অপচয় রোধে অন্যান্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য এটি একটি অনুকরণীয় ও ইতিবাচক নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি খালটি পুনঃখননের ফলে এলাকার কৃষি সেচ ও জলবদ্ধতা নিরসনে যেমন সুফল আসবে, তেমনি প্রশাসনিক স্বচ্ছতার কারণে প্রশাসনের প্রতি স্থানীয় জনগণের চিকিৎসাসংক্রান্ত ও সামাজিক আস্থা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।


