বেনামী প্রতিষ্ঠানে ৫০০ কোটি টাকা ঋণের অভিযোগে দুদকে আবেদন: ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন

বেনামী প্রতিষ্ঠানে ৫০০ কোটি টাকা ঋণের অভিযোগে দুদকে আবেদন: ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ৩৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করার জেরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসীন আলী ব্যাংকটির মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। প্রশাসনিক অনুশাসন ও প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন না নিয়ে অভিযোগ দায়েরের কারণ দেখিয়ে ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ তার বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
জানা গেছে, গত ২৯ জুলাই ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বেনামী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে দুদকে একটি আবেদন জমা দেন ইয়াসীন আলী। এই ঘটনা সংক্রান্ত বিবরণ প্রকাশের পরপরই ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয় এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ এনে মঙ্গলবার তাকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে ব্যাংকটির ট্রেনিং একাডেমিতে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি অনুযায়ী মূল বেতনের অর্ধাংশ খোরপোষ ভাতা হিসেবে পাবেন বলে জানা গেছে।
ব্যাংকের প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং ঘটনা তদন্তের বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন জানান, প্রধান কার্যালয়ের কোনো পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে একজন কর্মকর্তা এককভাবে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বা ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ উপস্থাপন করতে পারেন না। শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে মানবসম্পদ বিভাগ তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঘটনার সার্বিক কারণ পর্যালোচনা ও বিষদ অনুসন্ধানের জন্য ইতোমধ্যে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর ব্যাংকের প্রচলিত আইন ও চাকরি বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মুখে পড়া কর্মকর্তা ইয়াসীন আলীর দাবি, তিনি নিজের একক সিদ্ধান্তে এই পদক্ষেপ নেননি। তিনি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করেই দুদকে তথ্য সংবলিত আবেদন জমা দিয়েছিলেন। এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি ও নানা অনিয়মের বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে দায়ের করা একাধিক চলমান মামলার অংশ হিসেবে এবং আদালতের নির্দেশনার আলোকে দুদকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্য প্রদান করা হয়েছে। তবে বরখাস্তের শর্তাবলী বা নির্দেশনার বিস্তারিত বিষয় নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে বিষয়টির আইনগত রূপরেখা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কমিশন পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন প্রাপ্ত এসব অভিযোগের ওপর আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান বা তদন্ত পরিচালনা করার আইনি সুযোগ নেই। পরবর্তীতে কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে এই আবেদন এবং এর সাথে সংযুক্ত নথিপত্রসমূহ যাচাই-বাছাই ও প্রাথমিক পর্যালোচনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অন্যতম বৃহৎ একক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকে বিগত কয়েক বছরে বড় অঙ্কের বেনামী ঋণ ও আর্থিক অনিয়মের যে অভিযোগগুলো উঠেছে, এটি তারই একটি ধারাবাহিক অংশ। তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অন্যদিকে আর্থিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তদন্ত নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি। ঋণ সংক্রান্ত নথিপত্র ফাঁস ও দুদকে অভিযোগ প্রদানকে কেন্দ্র করে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ওপর নির্ভর করছে এই ঘটনার চূড়ান্ত প্রশাসনিক ও আইনি গতিপথ।
অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ