মার্কিন সামরিক বাহিনীতে যৌন নিপীড়ন কমলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগের হার বৃদ্ধি

মার্কিন সামরিক বাহিনীতে যৌন নিপীড়ন কমলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগের হার বৃদ্ধি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মার্কিন সামরিক বাহিনীতে সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সদস্যদের মধ্যে যৌন নিপীড়নের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তবে নিপীড়নের সামগ্রিক ঘটনা হ্রাস পেলেও আক্রান্তদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের প্রবণতা বেড়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের প্রকাশিত বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে সক্রিয় দায়িত্বে নিয়োজিত প্রায় ২০ হাজার ৪৯২ জন সেনাসদস্য অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন সংস্পর্শ বা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৯ হাজার ৮৬০ জন নারী এবং ১০ হাজার ৬৩২ জন পুরুষ সদস্য রয়েছেন। ২০২৩ সালের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। ২০২৩ সালে সামরিক বাহিনীতে যৌন নিপীড়নের আনুমানিক শিকার ছিলেন প্রায় ২৯ হাজার সদস্য। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে নিপীড়নের ঘটনা প্রায় ৮ হাজার ৫০০টি কমেছে। এর আগে ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার ৯০০।

সামরিক বাহিনীতে নারী ও পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই নিপীড়নের হার নিম্নমুখী। নারী সদস্যদের ক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের হার ২০২৩ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পুরুষ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশে নেমে এসেছে।

ঘটনাসংখ্যা হ্রাসের বিপরীতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক অগ্রগতির লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে যৌন নিপীড়নের ৭ হাজার ৯৯৮টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে মোট ভুক্তভোগীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন। ২০২৩ সালে আনুমানিক আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছিলেন।

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, ঘটনার আনুষ্ঠানিক রিপোর্টিং বৃদ্ধি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। এর ফলে ভুক্তভোগী সদস্যদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা, মানসিক কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান সহজ হয়। পাশাপাশি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের সামরিক আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

যৌন নিপীড়নের পাশাপাশি যৌন হয়রানির ঘটনাও কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় ৪৪ হাজার ৬৫৬ জন সেনাসদস্য যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার তথ্য দিয়েছেন, যা মোট বাহিনীর ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। নারী সদস্যদের মধ্যে যৌন হয়রানির হার ২০২৩ সালের ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।

মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর শাখাগুলোর মধ্যে যৌন নিপীড়নের হারে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে। নারী সদস্যদের মধ্যে মেরিন কোরে নিপীড়নের হার সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৮ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে পুরুষ সদস্যদের ক্ষেত্রে নৌবাহিনীতে এই হার ছিল সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বিমানবাহিনীতে এই ধরনের ঘটনার হার সবচেয়ে কম; যেখানে নারী সদস্যদের মধ্যে ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ নিপীড়নের তথ্য পাওয়া গেছে।

সামরিক বিচারব্যবস্থার প্রতি সদস্যদের আস্থা বৃদ্ধির বিষয়টিও পর্যালোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৭২ শতাংশ নারী এবং ৮০ শতাংশ পুরুষ সদস্য মনে করেছেন যে অভিযোগ তদন্ত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের সাথে সুবিচার করা হয়েছে। তবে স্বাধীন তদন্ত কাঠামোর ওপর নারী সদস্যদের পুরোপুরি আস্থা এখনো তৈরি হয়নি। গুরুতর অপরাধ তদন্তে গঠিত বিশেষ প্রসিকিউশন সংস্থার প্রতি পুরুষ সদস্যদের ৬৫ শতাংশ আস্থা প্রকাশ করলেও নারী সদস্যদের মধ্যে এই হার ছিল মাত্র ৪৪ শতাংশ।

প্রক্রিয়াগত জটিলতার পাশাপাশি প্রতিশোধের ভয় এখনো অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া নারী সদস্যদের ১৭ শতাংশ জানিয়েছেন, ঘটনা প্রকাশের পর তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য বা প্রতিশোধমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া সহযোদ্ধাদের নেতিবাচক মনোভাবের আশঙ্কায় অনেকেই এখনো মুখ খুলতে দ্বিধা করেন।

২০২৩ সাল থেকে সামরিক বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার আনা হয়। এর আওতায় যৌন নিপীড়ন, হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধের তদন্ত ও বিচারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ইউনিট কমান্ডারের নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে স্বাধীন প্রসিকিউটরের হাতে ন্যস্ত করা হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মী ও প্রস্তুতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অ্যান্টনি টাটা জানিয়েছেন, মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা সামরিক প্রস্তুতির মূল ভিত্তি। এই মূল্যবোধ বিনষ্টকারী যেকোনো অপরাধ প্রতিরোধে বাহিনীতে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে।

তবে সরকারি এই পরিসংখ্যান নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে অধিকারকর্মী সংগঠন ‘প্রটেক্ট আওয়ার ডিফেন্ডার্স’। সংগঠনটির দাবি, কেবল সংখ্যার হ্রাসকে প্রকৃত পরিস্থিতির সম্পূর্ণ উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাস্তবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের ঝুঁকির কারণে অভিযোগ না করার মানসিকতা এখনো বিদ্যমান রয়েছে, যা বাস্তব চিত্রের ভিন্নতা নির্দেশ করতে পারে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে পেন্টাগন বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিরোধ কর্মসূচি পুনর্মূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ