আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানি তেহরান সফর করেছেন। সেখানে তিনি ইরানের শীর্ষপর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি একটি সংলাপের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ কাতারের মধ্যস্থতায় এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কাতার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, আঞ্চলিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো কূটনীতি ও পারস্পরিক আলোচনা। আলোচনা চলাকালীন উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থাবৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
চলমান এই আলোচনার অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের এই জলপথ দিয়ে বিশ্ববাজারের একটি বিরাট অংশের জ্বালানি তেল ও রসদ পরিবাহিত হয়, ফলে এর নিরাপত্তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে কাতার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। চলতি বছরের জুনে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক তৈরিতেও দোহার ভূমিকা ছিল। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য কৌশলগত বিষয় নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় সেই সমঝোতার পূর্ণ বাস্তবায়ন সাময়িকভাবে আটকে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঝুলে থাকা সমঝোতা পুনরায় সচল করার চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই চলমান কূটনৈতিক সংকটে কাতারের পাশাপাশি পাকিস্তানও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ প্রস্তাব ইরানের নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেন। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরানের ওপর থেকে কঠোর অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর বিনিময়ে তেহরানকে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের তৎপরতা সীমিত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ইরান ও ওমান পৃথকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানিয়েছেন, একটি সম্ভাব্য অস্থায়ী ব্যবস্থার অধীনে কেবল বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ইরান ও ওমানের জলসীমা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে এই অস্থায়ী ব্যবস্থার কঠোর শর্ত হিসেবে সামরিক জাহাজগুলোকে এর আওতার বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে জুনের সমঝোতার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে।
একদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগ চলমান থাকলেও, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার কৌশল থেকে সরে আসেনি। মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের মতে, সামরিক সংঘাত এড়াতে এবং তেহরানকে টেবিলে আনতে অর্থনৈতিক চাপ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন করে কোনো চুক্তি বা আলোচনায় যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, বরং ওয়াশিংটন চাপ প্রয়োগের নীতি অব্যাহত রাখবে।
সব মিলিয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর এই তেহরান সফরকে ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাতের আবহে নতুন করে কূটনৈতিক পথ উন্মোচনের একটি বড় প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল নির্বিঘ্ন করা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ হ্রাস করা এবং দুই দেশের মধ্যে পুনরায় সরাসরি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সংলাপের প্রক্রিয়া চালু করাই এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য। এই উদ্যোগের সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং আঞ্চলিক অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকার ওপর।


