অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের স্বাবলম্বী ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এই উদ্যোগের আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি ব্যবসায়িক প্রকল্পের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করা হবে, যার অর্ধেক অংশ ব্যাংকঋণ এবং বাকি অর্ধেক অনুদান হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের স্ব স্ব শাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের অনুসন্ধান করবে এবং পরবর্তীতে তাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করবে। প্রাথমিক বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পর উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী ব্যাবসায়িক ধারণা এবং প্রকৃত অর্থের চাহিদা গভীরভাবে মূল্যায়ন করে এই অর্থায়ন প্যাকেজ ছাড় করা হবে।
ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিটি তরুণ উদ্যোক্তা তাদের প্রকৃত প্রয়োজন সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা পাবেন। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ বা ১০ লাখ টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকঋণ হিসেবে এবং বাকি ৫০ শতাংশ বা ১০ লাখ টাকা শর্তসাপেক্ষ অনুদান হিসেবে প্রদান করা হবে। গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋণের সর্বোচ্চ সুদ বা মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিশেষ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে কোনো ধরনের সহায়ক জামানত বা মর্টগেজ গ্রহণের প্রয়োজন হবে না, যা তরুণদের ব্যবসা শুরুর পথকে আরও সহজ করবে।
তবে ঋণ পরিশোধের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর শর্তও রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার অনুকূলে বরাদ্দকৃত অনুদানের অর্থ সম্পূর্ণ সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে। একই সঙ্গে ঋণ হিসাবটি প্রচলিত ব্যাংকিং নিয়মানুযায়ী শ্রেণীকৃত হয়ে খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তা পরবর্তীতে ব্যাংকিং খাত থেকে নতুন কোনো ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা স্থায়ীভাবে হারাবেন।
এই কর্মসূচির আওতায় আবেদনের সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হতে হবে এবং আবেদনের শেষ তারিখে তার বয়স অনূর্ধ্ব ২৮ বছর হতে হবে। পাশাপাশি তাকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। ব্যবসা পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়, তবে আবেদনকারীর একটি বাস্তবসম্মত ও লাভজনক ব্যাবসায়িক ধারণা থাকতে হবে। কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, মৎস্য চাষ, পশুপালন, পর্যটন, সেবা খাত কিংবা আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক যেকোনো বৈধ ও লাভজনক উদ্যোগকে এই কর্মসূচির আওতায় বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখায় নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ ও জমা দিয়ে আবেদন করা যাবে।
আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিস্তারিত রূপরেখা ও নির্দেশিকা সংবলিত আনুষ্ঠানিক সার্কুলার জারি করা হবে। সার্কুলার প্রকাশের পরবর্তী এক মাস দেশব্যাপী আবেদন গ্রহণের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত থাকবে। দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে আটটি বিভাগের আটটি জেলার মোট ৬৪টি উপজেলায় এই পাইলট প্রজেক্ট শুরু হবে। জেলাগুলো হলো মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর এবং নেত্রকোনা। প্রতিটি নির্বাচিত উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রথম ধাপে বাছাই করা হবে। পরবর্তীতে এই কার্যক্রমের পরিধি পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলার প্রতিটি উপজেলায় সম্প্রসারিত হবে এবং প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাকে আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই কর্মসূচির ব্যাপ্তি কেবল আর্থিক অনুদান ও ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদী সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ ও পেশাদার মেন্টরের ধারাবাহিক পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন ও আধুনিক ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়নে আইনি ও কারিগরি সহায়তা এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বাজার সংযোগের সুবর্ণ সুযোগ দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই যুগান্তকারী কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সফল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা গড়ে ওঠার পথ সুগম হবে। এর ফলশ্রুতিতে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে উপজেলা পর্যায়ের তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।


