মাদক নির্মূল না করে কক্সবাজার ছাড়ব না: চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি

মাদক নির্মূল না করে কক্সবাজার ছাড়ব না: চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি

অপরাধ ডেস্ক
কক্সবাজারকে মাদকমুক্ত না করে কর্মস্থল ত্যাগ না করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসায়ী, সেবনকারী এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরক্ষভাবে জড়িত কোনো ব্যক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্য যদি মাদকের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ দেন, তবে তাকেও কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে।
গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় বক্তৃতাকালে ডিআইজি বলেন, কক্সবাজার একটি সীমান্তবর্তী ও পর্যটনবহুল জেলা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই এলাকাকে মাদকমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বাধীন এলাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখান থেকেই যদি সফলভাবে মাদক নির্মূল করা সম্ভব না হয়, তবে সেই ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে তিনি অন্যত্র বদলি হতে চান না।
সভায় কক্সবাজারের বিগত দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। তিনি বলেন, বিগত দিনে কক্সবাজারের বহু মাদক ব্যবসায়ী ও গডফাদার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। অতীতে যারা মাদকের অর্থ ও ক্ষমতার জোরে এমপি কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন, তারাই মূলত এই অঞ্চলে মাদকের স্থায়ী বিস্তার ঘটিয়েছেন। এই ধরনের অপসংস্কৃতিকে ফ্যাসিবাদের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ফলেই শান্তির এই শহর ক্রমান্বয়ে অশান্ত হয়ে উঠেছিল। বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশে সব পুরনো সিন্ডিকেট ও ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে কক্সবাজারকে একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ এবং উন্নত পর্যটন নগরীতে রূপান্তর করা হবে।
মাদকবিরোধী চলমান অভিযানে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ডিআইজি জানান, কক্সবাজারে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধী যতই প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান হোক না কেন, তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই হবে পুলিশের মূল লক্ষ্য। মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, যারা অবৈধ উপায়ে আখের গোছানোর স্বপ্ন দেখছেন, তাদের সেই দিন শেষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে পারলেও স্থায়ীভাবে অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না।
সুধী সমাবেশে কক্সবাজারের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে বক্তব্য দেন জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান। তিনি জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় ৯০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। তবে চলতি বছরের একই সময়ে (জুলাই পর্যন্ত) হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কিছুটা কমে ৮৮টিতে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশি তৎপরতা ও মাদকবিরোধী জোরালো অভিযানের ফলে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের জুলাই পর্যন্ত যেখানে প্রায় পাঁচ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৩৩ লাখ পিস ইয়াবা।
নিজের পেশাগত সততা ও নৈতিকতার কথা তুলে ধরে পুলিশ সুপার বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কক্সবাজারের স্থায়ী বাসিন্দা না হলেও এই শহরের আলো-বাতাসেই তার জীবন ও জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। নিজের সন্তানের মুখে হারাম আহার তুলে দিতে চান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অনৈতিক সমঝোতা করা হবে না। এছাড়া সাধারণ মানুষকে থানায় সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দালাল চক্র ও আর্থিক লেনদেন থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, থানায় জিডি বা মামলা করতে কিংবা সাধারণ পুলিশি সেবা পেতে কোনো ধরনের অর্থের প্রয়োজন নেই। সাধারণ জনগণের সহযোগিতাই অপরাধ দমনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সুধী সমাবেশ শেষে কক্সবাজার শহরে একটি বিশাল মাদকবিরোধী র‌্যালি বের করা হয়, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ