আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে উদ্ভূত তীব্র অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটার নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ইরান। দেশটির নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক চাপ ও অবরোধের মাধ্যমে তেহরানের কৌশলগত অবস্থান বা নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
রোববার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ জানান, মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ এবং নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর করতে সরকার বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মোর্তেজা জামানিয়ান জানান, যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া জটিলতা কাটাতে মন্ত্রণালয়ের বিশেষায়িত ‘ইকোনমিক ওয়ার হেডকোয়ার্টার্স’ বর্তমানে জোরালোভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এক বক্তব্যে বলেন, সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে বড় লড়াই উৎপত্তির সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকা রক্ষা করা। মুদ্রার বিনিময় হার পতন, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অবনতিকে তিনি বর্তমান সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের সাধারণ মানুষ যেকোনো সংকট ও কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত রয়েছে, তবে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও নিষ্ক্রিয়তা তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
সামরিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়ে স্পিকার কালিবাফ জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুধাবন করতে হবে যে বর্তমান সংঘাতে ‘খেলার নিয়ম সম্পূর্ণ বদলে গেছে’। ভবিষ্যতে ইরানের স্বার্থ বা নিরাপত্তার ওপর কোনো ধরনের হামলা হলে তা আরও দ্রুত, শক্তিশালী এবং বেদনাদায়ক উপায়ে প্রতিহত করা হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালির বাইরে একটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করা হবে। ওই নির্ধারিত জলসীমায় প্রবেশকারী সন্দেহভাজন জাহাজগুলোকে পুনরায় নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে।
উল্লেখ্য, ইরানের তেল রপ্তানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি ও খার্গ দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে দেশটির মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই খার্গ দ্বীপের রপ্তানি টার্মিনাল দিয়োন্তরিত হতো। তবে বর্তমান মার্কিন অবরোধ ও সামুদ্রিক সংঘাতের কারণে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা চরম চাপের মুখে রয়েছে। দেশটির তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ জানান, গত কয়েক মাসে খার্গ দ্বীপের বিভিন্ন টার্মিনাল লক্ষ্য করে কয়েকশ দফা হামলা চালানো হলেও এই জ্বালানি কেন্দ্রটির operational কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখতে বিকল্প পাইপলাইন ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সার্বিক জ্বালানি প্রবাহ বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যেও দুই-তৃতীয়াংশ স্তরে বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর মাধ্যমে এই সংঘাতের সূচনা হয়। জুনের শুরুতে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই জনপদে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক কার্যক্রম এবং উত্তেজনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।


