আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। এর পাশাপাশি এই জলপথের চারপাশে শিগগিরই একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত এলাকা বা রেস্ট্রিক্টেড জোন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। গত কয়েক দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্র করে চলা তীব্র ভূরাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে এই কঠোর অবস্থান জানানো হলো।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন এই নিয়ন্ত্রিত এলাকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। প্রস্তাবিত এই অঞ্চলটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ রেখা থেকে শুরু করে উপসাগরীয় ভূখণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত এই জোনে অননুমোদিতভাবে প্রবেশকারী যেকোনো জলযানকে ইরানের কালোতালিকাভুক্ত করা হবে। পরবর্তীতে তেহরানের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া ওই জাহাজগুলোকে আর কখনোই এই জলপথ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না।
ইরানি কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রতিদিন যেখানে শত শত জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, সেখানে এখন মাত্র সাত থেকে আটটি জাহাজ কোনো রকমে এই প্রণালি অতিক্রম করছে। মার্কিন বাহিনী মাঝেমধ্যে ওমানের কাছাকাছি জলসীমায় পাঁচ থেকে ছয়টি জাহাজকে পাহারায় রেখে বা এসকর্ট করে পার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে রেজাইয়ের দাবি, ওই জাহাজগুলোও নিয়মিত হামলার মুখে পড়ছে এবং অক্ষত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না।
এদিকে, তেহরানের এমন দাবির ঠিক বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক বাণিজ্য তদারকি সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)। সংস্থাটির প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্তত ৫৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে যাতায়াত করেছে। তবে সংঘাতের এই আবহে মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটটির বর্তমান ঝুঁকির মাত্রাকে অত্যন্ত ‘মারাত্মক’ বলে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়েছে তেহরান। মোহসেন রেজাই দাবি করেছেন, এর আগের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি রণতরী থেকে নিক্ষেপযোগ্য বা ডেস্ট্রয়ার-লunchড একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজে সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধাবস্থার কারণে সম্ভাব্য দেশীয় অর্থনৈতিক সংকটের শঙ্কা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে তিনি জানান, ইরানে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে পেট্রোলিয়াম বা তেল বিক্রি এবং এর লেনদেন ও অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়াও পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি রুট ঘিরে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ বা ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধিসহ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির বড় একটি অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।


