রাজনীতি ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এবং পরবর্তীতে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হলেও, শুধু দলীয় বহিষ্কারের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হচ্ছে না বলে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ও আইনি পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, সংবিধান ও দেশের বিদ্যমান নির্বাচনী আইন অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক দল তাদের কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই পদ বাতিলের প্রক্রিয়াটি একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘ আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
আইনি প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনার জানান, কোনো সংসদ সদস্যের পদ থাকা না-থাকা নিয়ে যদি বিতর্ক বা বিরোধের সৃষ্টি হয়, তবে প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে হয় জাতীয় সংসদের স্পিকার বা সংসদকে। যদি স্পিকার বা জাতীয় সংসদ বিষয়টি সুরাহা বা দিকনির্দেশনার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠায়, কেবল তখনই ইসি বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের এখতিয়ার অর্জন করে। অভিযোগ পাওয়ার পর কমিশন সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের বক্তব্য ও যুক্তি শুনবে এবং সংবিধান অনুযায়ী যথাযথ আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনো সংসদ সদস্য স্বেচ্ছায় দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে স্বীয় দলের বিরুদ্ধে ভোটদান করেন, তবে তাঁর সংসদীয় আসন সরাসরি শূন্য হবে। কিন্তু বর্তমান সংবিধানে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য পদ সরাসরি বাতিল হওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনুচ্ছেদ ৭০-এর মূল লক্ষ্য সংসদ সদস্যদের দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অনাস্থা প্রস্তাব বা গুরুত্বপূর্ণ বিলে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোটদান রোধ করা; দল কর্তৃক কোনো সদস্যকে বহিষ্কারের পর তাঁর সংসদীয় পদের পরিণতি কী হবে, সে বিষয়টি এখানে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য বিরোধ নির্ধারণ সংক্রান্ত আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো নির্বাচিত সদস্যের যোগ্যতা, অযোগ্যতা কিংবা আসন শূন্য হওয়া নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে তা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। নিয়ম অনুযায়ী, এমন কোনো বিতর্ক বা বিরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের স্পিকারকে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে হয়।
স্পিকারের কাছ থেকে লিখিত রেফারেন্স বা ফাইল পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন দেওয়ানি আদালতের সমকক্ষ এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে। কমিশন সংক্ষুব্ধ ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষকে উপস্থিত করে নিরপেক্ষ শুনানি গ্রহণ করবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য আইনের অধীনে কমিশন সর্বোচ্চ ১২০ দিন সময় পাবে। এই সময়ের মধ্যে ইসি যে সিদ্ধান্ত প্রদান করবে, আইনে তা-ই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে এবং পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নের জন্য স্পিকারের কাছে ফেরত পাঠানো হবে।
ঘটনার পটভূমি পর্যালোচনায় জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি বিতর্কিত ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিওচিত্র সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। দলগত ভাবমূর্তি রক্ষা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার স্বার্থে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাৎক্ষণিকভাবে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ এনে তাঁকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
তবে রাজনৈতিক এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক কোনো আইনি প্রভাব সংসদ সদস্যপদের ওপর পড়ছে না। ফলে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদীয় সীমানায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনি বিশ্লেষকদের মতে, স্পিকার যতক্ষণ না বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাচ্ছেন এবং ইসি শুনানি শেষে চূড়ান্ত কোনো রায় দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত গাজী নজরুল ইসলাম আইনিভাবে সাতক্ষীরা-৪ আসনের বৈধ সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেন।


