বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬.৪৭ বিলিয়ন ডলার, ২০ দিনে এলো ১৮০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬.৪৭ বিলিয়ন ডলার, ২০ দিনে এলো ১৮০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স

অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে রিজার্ভের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে চলতি জুলাই মাসের প্রথম ২০ দিনেই ১৮০ কোটি ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। প্রবাসী আয়ের এই জোরালো প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ শক্তিশালী করতে এবং সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৪৬৫ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা অঙ্কের হিসাবে প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল-৬ (বিপিএম-৬) অনুসারী আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হিসাব করলে দেশের ব্যবহারযোগ্য বা নিট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৭৭০ দশমিক ০৮ মিলিয়ন ডলার বা ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, চলতি জুলাই মাসের প্রথম ২০ দিনে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে মোট ১৮০ কোটি ২৬ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলো শীর্ষ ভূমিকা পালন করেছে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে এসেছে ১২৬ কোটি ৬৪ লাখ মার্কিন ডলার। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৮ কোটি ৭৮ লাখ ডলার এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৪ কোটি ৫২ লাখ ডলার। এছাড়া বাংলাদেশে পরিচালিত বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩০ লাখ মার্কিন ডলার।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর দেয়া প্রণোদনা, প্রবাসী আয়ে ডলারের বিনিময় হার প্রতিযোগিতামূলক করা এবং অবৈধ হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারির ফলেই ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের এই সুবাতাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে উৎসব-পার্বণ ছাড়াও নিয়মিত বিরতিতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা মূলধনি হিসাব ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

প্রসঙ্গতঃ বিগত কিছুদিন ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিতিশীলতা কাটাতে নানা ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখার প্রথাগত চেষ্টা থেকে সরে এসে বাজারভিত্তিক কিংবা নির্দিষ্ট ব্যান্ডের মধ্যে বিনিময় হার নির্ধারণের যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, তা বৈধ চ্যানেলে অর্থ আসা বাড়িয়ে দিতে বিশেষ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ পাঠাতে আগের চেয়ে বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন, যা প্রথাগত বা অবৈধ পথে অর্থ লেনদেনের আকর্ষণ অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।

এছাড়া প্রবাসী আয় উৎসাহিত করতে সরকারের দেয়া নীতিগত সহায়তা এবং ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর সঙ্গে চুক্তি সম্প্রসারণ করার ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাভোগীদের কাছেও দ্রুত রেমিট্যান্সের অর্থ পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঋণমান নির্ধারণের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও আমদানি ব্যয়জনিত চাপের প্রেক্ষাপটে রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দেশের প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক আমদানি বিল পরিশোধ করা সহজ হবে এবং বিদেশি ঋণ ও সুদের কিস্তি যথাসময়ে মেটানো সম্ভব হবে। অর্জিত এই রিজার্ভ দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা ও বৈদেশিক দেনা মেটানোর সক্ষমতাকে দৃশ্যমানভাবে সংহত করেছে।

আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রবাসীদের আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী গতিধারা বজায় থাকলে এবং রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারায় থাকলে আগামী দিনগুলোতে রিজার্ভ আরও সুসংহত হবে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় গৃহীত কৌশলগত সংস্কারগুলো দীর্ঘমেয়াদে বাজারে মুদ্রার যোগান বৃদ্ধি করবে, যা জাতীয় মুদ্রা টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ