ময়মনসিংহে নিখোঁজ যুবকের মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার: নেপথ্যে পারিবারিক বিরোধের সন্দেহ

ময়মনসিংহে নিখোঁজ যুবকের মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার: নেপথ্যে পারিবারিক বিরোধের সন্দেহ

অপরাধ ডেস্ক

ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে ১৬ দিন ধরে নিখোঁজ থাকা সোহেল মিয়া (২৬) নামে এক যুবকের মাথাবিহীন ও মাটিচাপা দেওয়া মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত তরুণ পেশায় একজন গাছকাটা শ্রমিক ছিলেন। তিনি উপজেলার পরানগঞ্জ ইউনিয়নের মীরকান্দাপাড়া এলাকার নূরুল ইসলাম ও জুলেখা বেগম দম্পতির ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বুধবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত অম্বিকাগঞ্জ কলেজ মাঠ সংলগ্ন সীমানা প্রাচীরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা ও মাটিচাপা দেওয়া বাকি দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ জুলাই রাত আটটার দিকে নিজ বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ হন সোহেল। স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে সন্ধান চালিয়েও তার কোনো খোঁজ পাননি। পরবর্তীতে বুধবার সকালে এ বিষয়ে নিহতের বাবা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন। জিডি করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অম্বিকাগঞ্জ কলেজ মাঠ থেকে তার মরদেহের সন্ধান মিলে।

ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে অম্বিকাগঞ্জ কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মো. মাহবুবুল আলম জানান, মঙ্গলবার কলেজের জন্য নতুন একটি একাডেমিক ভবন বরাদ্দ পাওয়ার পর জমির অবস্থান চিহ্নিত করতে বুধবার দুপুর পৌনে তিনটার দিকে শিক্ষক ও কর্মচারীদের একটি দল মাঠে যান। মাঠের সীমানা প্রাচীরের একটি অংশ ভাঙা দেখে এগিয়ে গেলে তারা তীব্র দুর্গন্ধ অনুভব করেন। দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে ভাঙা প্রাচীরের পাশে মানুষের একটি বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্ধার হওয়া মাথাটি নিখোঁজ সোহেলের বলে শনাক্ত করেন।

পরবর্তীতে মরদেহের বাকি অংশ উদ্ধারে রাত পৌনে আটটার দিকে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে মাটি খননকাজ শুরু করে। খনন প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে প্রথমে দুটি গ্লাভস এবং পরবর্তীতে প্রায় চার ফুট গভীর মাটি থেকে রাত পৌনে নয়টার দিকে সোহেলের মাথাবিহীন দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে নিহতের ভগ্নিপতি সেলিম মিয়ার সম্পৃক্ততার কঠোর অভিযোগ তুলেছে নিহতের পরিবার। সোহেলের শ্বশুর আলাল উদ্দিন জানান, সোহেল ও সেলিম যৌথভাবে গাছ কাটার কাজ করলেও পারিশ্রমিক বণ্টন নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিরোধ বিদ্যমান ছিল। সেলিম নিয়মিত কাজের মজুরি কম দিতেন এবং সোহেলকে নির্যাতন করতেন। এই বিরোধের জেরে সোহেল পরবর্তীতে ঢাকায় গিয়ে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। সম্প্রতি তিনি বাড়িতে এলে সেলিম তাকে পুনরায় কাজের কথা বলে ডেকে নিয়ে যান। এরপর থেকেই সোহেলের কোনো সন্ধান মেলেনি। এ বিষয়ে সেলিমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং ঘটনার আগের দিন মঙ্গলবার থেকে আত্মগোপনে চলে যান। দুর্গন্ধ না ছড়ালে মরদেহের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হতো না উল্লেখ করে নিহতের পরিবার এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, পচনধরা মাথাবিচ্ছিন্ন মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। স্বজনেরা সোহেলকে শনাক্ত করলেও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চূড়ান্ত পরিচয় নিশ্চিত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তলব করে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তা আরও নিশ্চিত করেন যে, ঘটনার পর থেকে নিহতের ভগ্নিপতি সেলিম পলাতক রয়েছেন। পারিবারিক আর্থিক বিরোধ বা অন্য কোনো কারণে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ করে দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শীর্ষ সংবাদ সারাদেশ