আইন আদালত ডেস্ক
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল প্রসিকিউশনের আবেদনের শুনানি শেষে এ নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে চলমান মামলায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হলো।
বৃহস্পতিবার সকালে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় মোজাফফর হোসেনকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয় এবং প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে হাজতখানায় রাখা হয়। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর গঠিত বেঞ্চে হাজির করা হয়। আদালত শুনানি শেষে প্রসিকিউশনের আনা আবেদন মঞ্জুর করে মোজাফফর হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলায় আসামি হিসেবে নিবন্ধিত ও গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট বা হাজিরা পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়, বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সহিংসতায় অভিযুক্তের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। উক্ত অভিযোগের অধিকতর তদন্ত এবং জিজ্ঞাসাবাদের স্বার্থেই তাকে হেফাজতে রেখে বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ট্রাইব্যুনাল তাকে সুনির্দিষ্ট ধারায় হাজির করার নির্দেশ দেন।
ঐতিহাসিক পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। ওই হত্যাকাণ্ডের পরপরই সামরিক আদালতে বিচার কাজ পরিচালিত হয়, যেখানে মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে অবস্থান করছিলেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেনা হেফাজতে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
একই দিনে ট্রাইব্যুনালে অন্য একটি মামলার প্রসিকিউশন প্রক্রিয়াও পরিচালিত হয়। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ফেনী অঞ্চলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অপর আসামি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি আদালতের কার্যসূচিতে ছিল। আদালত মামলা দুটির বিভিন্ন উপাদানের আন্তঃসম্পর্ক ও যৌথ প্রক্রিয়ার স্বার্থে সামগ্রিক বিচারিক বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু বছর পর পুরোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আসামিদের নতুন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় আনা দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এতে একদিকে যেমন অতীতের অমীমাংসিত আইনি বিষয়গুলো আবার সামনে আসছে, অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা ফুটে উঠছে। প্রসিকিউশন দল জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনালের এই আদেশের পর এখন মোজাফফর হোসেনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রদেয় আবেদনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বিগত সময়ের সহিংসতায় তার ভূমিকার সুনির্দিষ্ট মাত্রা এবং তথ্যপ্রমাণ উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।


