আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত ও অবরোধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাসে এই কৌশলগত প্রণালী দিয়ে মাত্র ১,৪৫৪টি জাহাজ চলাচল করতে পেরেছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ যাতায়াত করলেও বর্তমানে তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। উদ্ভূত এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং জ্বালানি বাজারে মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি করেছে।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ প্রণালীটি বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিশ্লেষকদের প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী, সংঘাতের সূচনা এবং ইরানের সামরিক পদক্ষেপের পরপরই এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে, গত ২ মার্চ ইরানের সামরিক বাহিনী প্রণালীটি বন্ধের আনুষ্ঠানিক বার্তা দেওয়ার পর সাধারণ বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সময়কালে এই পথে মাত্র ২৭৮টি জাহাজ চলাচল করে, যা দৈনিক গড়ে সাতটিতে নেমে আসে।
পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন ১৩ এপ্রিল মার্কিন প্রশাসন ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও নৌ-অবরোধ আরোপ করে। ফলে মধ্য-এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই অচলাবস্থা অব্যাহত থাকে এবং জাহাজ চলাচলের দৈনিক গড় সাতটিতেই স্থির থাকে। সংঘাতের এই সময়ে কেবল তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও কনটেইনার জাহাজই নয়, বরং ড্রাই বাল্ক ক্যারিয়ার, সাধারণ কার্গো এবং যানবাহন পরিবাহী জাহাজের পরিবহনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ১ মার্চ একাধিক জ্বালানি ট্যাঙ্কারে হামলা এবং জুন মাসে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের ঘটনা আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন সংস্থাগুলোর উদ্বেগকে আরও উসকে দেয়।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা কূটনৈতিক অগ্রগতির ফলে জাহাজ চলাচলে সাময়িক পুনরুদ্ধার লক্ষ করা যায়। ১৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা অর্জিত হওয়ার পর ১৮ জুন থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত সময়ে মোট ৬১৫টি জাহাজ প্রণালীটি পার হতে সক্ষম হয়। এতে দৈনিক গড় জাহাজ যাতায়াত বেড়ে ২৩টিতে উন্নীত হয়েছিল। তবে ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কঠোর অবরোধ কার্যকর করার পর এই ইতিবাচক ধারা রুদ্ধ হয়ে যায়। ১৫ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে প্রণালীটি দিয়ে মাত্র ৯৯টি জাহাজ চলাচল করতে পারে, ফলে দৈনিক গড় পুনর্নবীকরণ হয়ে ১১টিতে নেমে আসে।
নৌচলাচলের এই নাটকীয় পতন কেবল সামুদ্রিক পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক স্থানে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক স্থবিরতা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।


