আইএমএফের বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩২.১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত

আইএমএফের বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩২.১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম৬) পদ্ধতি অনুসরণ করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস বা মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে রবিবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করার তথ্য জানানো হয়েছিল, যা পরদিন ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে আরও কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছায়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক খাতে আইএমএফের বিপিএম৬ হিসাব পদ্ধতিকে যেকোনো দেশের বৈশ্বিক ব্যবহারের উপযোগী রিজার্ভ গণনার সর্বজনগ্রাহ্য ও নিরপেক্ষ মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় রিজার্ভের মোট হিসাব থেকে বৈদেশিক মুদ্রার এমন সব সম্পদ বাদ দেওয়া হয়, যা স্বল্পমেয়াদে সহজে বা তরল আকারে ব্যবহারযোগ্য নয়। বিশেষ করে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ), অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রকল্পে দেওয়া ঋণ, ব্যাংকগুলোকে প্রদত্ত সহায়তা এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বা অনিষ্কাশনযোগ্য বৈদেশিক সম্পদ এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে বিপিএম৬ মানদণ্ডে প্রদর্শিত রিজার্ভ মূলত দেশের আকস্মিক বৈদেশিক দেনা মেটানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধ্যবাধকতা নিষ্পত্তির জন্য প্রকৃত ও ব্যবহারযোগ্য ক্ষমতার স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও নীতিগত অবস্থান বিশ্লেষণ করে জানা যায়, দেশের বৈদেশিক খাত এবং মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা টেকসই করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব নিয়ন্ত্রণমূলক ও তদারকিমূলক পদক্ষেপ জোরদার করেছে, তারই ধারাবাহিকতায় রিজার্ভের এই চিত্র সামনে এসেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্যে বেশ কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে খোলা বাজার ও ব্যাংকিং খাতে ডলারের সরবরাহ পর্যবেক্ষণ এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মুদ্রা ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা হচ্ছে।
রিজার্ভের এই ধারাবাহিক পুনরুদ্ধারের পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ের উর্ধ্বমুখী প্রবাহ এবং রপ্তানি খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বিপরীতে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার আসার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে ডলারের তারল্য সংস্থান উন্নত হয়, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ ও সঞ্চয় পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে। একই সাথে বৈদেশিক বাণিজ্যে সাম্প্রতিক শৃঙ্খলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চলতি হিসাব ঘাটতি হ্রাস পাওয়াও সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবকে সুসংহত করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মানদণ্ড অনুযায়ী একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অন্তত তিন মাসের পণ্য ও সেবা আমদানির ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির উপযোগী বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩২.১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ায় দেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্প কারখানার কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পাওনা মেটানোর পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে। এটি আমদানিকারক ও ব্যবসায়িক খাতের আস্থা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে এবং বাজার সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
একই সঙ্গে, বৈদেশিক মুদ্রার এই সন্তোষজনক অবস্থান আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে দেশের সার্বভৌম ঋণমান ও আর্থিক স্থিতিশীলতার চিত্র উন্নত করতে সহায়ক হবে। ডলারের বাজারে অস্থিরতা হ্রাসের ফলে দেশীয় মুদ্রার মান ও মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনায় পরোক্ষ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইঙ্গিত দিয়েছে যে, দেশের ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতিগত সজাগ দৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় বাজারমুখী সংস্কার অব্যাহত থাকবে।
অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ