ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার রূপরেখা ও বহুমাত্রিক সংস্কারের ঘোষণা সরকারের

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার রূপরেখা ও বহুমাত্রিক সংস্কারের ঘোষণা সরকারের

জাতীয় ডেস্ক
দেশের অর্থনীতিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বহুমুখী কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে সরকার। বাণিজ্য সহজীকরণ, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সমতার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক রূপান্তরের এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের কাজ পুরোদমে চলছে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তরে আয়োজিত এক সাক্ষাৎকারে সরকারের এসব নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কাঠামোগত সুবিধা
মুখপাত্র জানান, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজীকরণে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ (ওএসএস) ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক নিবন্ধন, অনুমোদন ও অন্যান্য সেবা একই ছাতার নিচ থেকে দ্রুততম সময়ে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে গতিশীল রাখতে এবং বন্দরকেন্দ্রিক জট এড়াতে ২৪ ঘণ্টা কার্গো সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প খাতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণকে উৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগগুলো দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও নতুন সুযোগ
রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বহির্বিশ্বে বন্ধ থাকা শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। মাহদী আমিন জানান, মালয়েশিয়ার সঙ্গে নিবিড় ও ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে স্থগিত থাকা শ্রমবাজার চালুর প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে চলতি আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ এই প্রক্রিয়ার সমস্ত জটিলতা পুরোপুরি অবসান হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। এই শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হলে পরবর্তী চার মাসের মধ্যে এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মীর জন্য দেশটিতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতি তুলে ধরে মুখপাত্র উল্লেখ করেন, বিগত দেড় দশকের ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট গভীর জ্বালানি সংকট মাত্র ছয় মাসের স্বল্প সময়ে শতভাগ দূর করা অত্যন্ত জটিল ও দুরূহ কাজ। তা সত্ত্বেও সরকার জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়ে সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ ও শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে তেল ও গ্যাস আমদানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে মার্কিন ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল, মালয়েশিয়ার জাতীয় তেল-গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস এবং চীনের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও চুক্তি পর্যালোচনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। বিকল্প এই সোর্সিং বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল হবে এবং শিল্প খাতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতি
সরকারের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি সম্পর্কে মুখপাত্র মাহদী আমিন স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান নীতিমালার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার সমুন্নত রেখে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভারতসহ বিশ্বের সকল বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী সরকার। একটি নিকটতম ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে আঞ্চলিক বাণিজ্য, ট্রানজিট ও অভিন্ন স্বার্থের ক্ষেত্রগুলোতে ভারত প্রয়োজনীয় ও পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে বর্তমান প্রশাসন প্রত্যাশা করে।
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও শ্রম খাতের স্থিতিশীলতা
দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী প্রাথমিক অর্জনগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরে মুখপাত্র জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পবিত্র রমজান এবং পরপর দুটি বড় উৎসবের সময়ে কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সহনশীল মাত্রায় রাখা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা ও বোনাস সঠিক সময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করার মাধ্যমে শ্রম অসন্তোষ নিরসন এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা গেছে, যা সার্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ