নারীকে  প্রকাশ্যে ইউপি চেয়ারম্যানের জুতাপেটার অভিযোগ

নারীকে প্রকাশ্যে ইউপি চেয়ারম্যানের জুতাপেটার অভিযোগ

আইন ও অপরাধ ডেস্ক

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় স্থানীয় একটি সালিশ বৈঠকে প্রকাশ্যে এক নারীকে জুতা দিয়ে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের বলাকিয়া গ্রামে একটি সালিশের আয়োজন করা হয়। ওই সালিশের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এক নারীর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী চারিপাড়া গ্রামের এক যুবকের কথিত অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ। সালিশ চলাকালে মাধবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফরিদ উদ্দিন উপস্থিত বহু মানুষের সামনে ওই নারীর চুলের খোঁপা ধরে জুতা দিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে সেই ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে জনসমক্ষে বিষয়টি প্রকাশ পায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চারিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় সবজি বিক্রেতা বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে ওই নারীর কথিত সম্পর্কের অভিযোগ তুলে স্থানীয় কয়েকজন তাদের আটক করেন। বিষয়টি নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে পরদিন বিকেলে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সালিশ বসানো হয়। সেখানে উপস্থিত সালিশকারীরা উভয়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তবে সালিশে সংশ্লিষ্ট পুরুষের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না বা হয়ে থাকলে তা কী ধরনের ছিল, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য কিংবা দৃশ্য দৃশ্যমান হয়নি।

প্রকাশ্যে একজন নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার এই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় মানবাধিকার সচেতন ব্যক্তি এবং বাসিন্দারা বলছেন, দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে কোনো ব্যক্তিকে এভাবে জনসম্মুখে শারীরিক নির্যাতন ও লাঞ্ছনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই ধরনের প্রকাশ্য সালিশি ব্যবস্থার কারণে ভুক্তভোগী নারী এবং তার পরিবার চরম সামাজিক অবমাননা ও মানসিক ট্রমার সম্মুখীন হচ্ছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা কার্যত স্বীকার করে দাবি করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার স্বার্থেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী প্রবাসীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও অন্য এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান এবং স্থানীয় লোকজন তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে। চেয়ারম্যান দাবি করেন, ঘটনার দিন উত্তেজিত জনতার রোষানল ও সম্ভাব্য বড় ধরনের শারীরিক আক্রমণ থেকে অভিযুক্তদের রক্ষা করতে স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের পরামর্শক্রমেই তিনি তাৎক্ষণিক এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেন।

তবে দেশের আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কিংবা গ্রাম্য মাতব্বর কারও ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানোর বা বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা প্রচলিত বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়াই আইনি বাধ্যবাধকতা।

ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসার পর পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন জানান, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি পুলিশের নজরে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, একজন নারীকে প্রকাশ্যে কেন এবং কী পরিস্থিতিতে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের ফলাফল ও প্রাপ্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

শীর্ষ সংবাদ সারাদেশ