জাতীয় ডেস্ক
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে এবং আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ওই বছরেরই ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। দীর্ঘ বিরতির পর সংসদ সদস্যদের ভোটে এবং সম্পূর্ণ নতুন সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো একক রাজনৈতিক দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতিকে সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত করার সাংবিধানিক বিধান পুনরায় চালু করা হয়। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য তৎকালীন নির্বাচন কমিশন দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় আইন ও নির্বাচনী বিধিমালা প্রস্তুত করে। সে সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছিলেন বিচারপতি আব্দুর রউফ।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী করা হয়েছিল আবদুর রহমান বিশ্বাসকে। তার বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট ৩৩০ জন ভোটার থাকলেও সেদিন ভোট প্রদান করেন ২৬৪ জন সংসদ সদস্য। ভোটদান থেকে বিরত থাকেন ৬৬ জন এমপি।
নির্বাচন পরিচালনার জন্য সে সময় জাতীয় সংসদের অভ্যন্তরীণ বিন্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল। অধিবেশন কক্ষে স্পিকারের নিয়মিত বড় চেয়ারের পরিবর্তে একটি ছোট চেয়ার স্থাপন করা হয়, যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার উপবিষ্ট ছিলেন। ভোটগ্রহণের জন্য সংসদ কক্ষে চারটি পৃথক বুথ স্থাপন করা হয়। দুপুর ঠিক দুইটায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভোটদানের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যরা একে একে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচনকালীন পোলিং অফিসারদের রেকর্ড অনুযায়ী, সে সময়ের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও নুরুল ইসলাম মনিও নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের ভোট প্রদান করেছিলেন।
তবে ১৯৯১ সালের এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয়। সংবিধানে সংশোধনী এনে এই নির্বাচনে গোপন ব্যালটের পরিবর্তে প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার বিধান চালু করা হয়েছিল। ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কিছু সময় পর বিরোধী দলের একদল সংসদ সদস্য সংসদ কক্ষে প্রবেশ করে প্রকাশ্যে ভোটগ্রহণের তীব্র বিরোধিতা করেন। জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই পদ্ধতিকে আইনসম্মত নয় আখ্যা দিয়ে আপত্তি জানান এবং প্রকাশ্যে ভোট প্রদানের সমালোচনা করেন। তাদের যুক্তি ছিল, প্রকাশ্যে ভোটদানের এই ব্যবস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাধীন ইচ্ছার পরিপন্থী।
সব ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে বিকেল পাঁচটায় ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হয় এবং সংসদ কক্ষেই ভোট গণনা শুরু হয়। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২টি ভোট পেয়ে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২টি ভোট। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের ভোটও এই গণনায় যুক্ত হয়েছিল।
১৯৯১ সালের ওই নির্বাচন শুধু একটি পদের নির্বাচন ছিল না, বরং এটি ছিল নবপ্রতিষ্ঠিত সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণের একটি বড় পরীক্ষা। পরবর্তীতে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়েনি। তবে ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবরের সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং প্রকাশ্যে ভোটদানের প্রক্রিয়া বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি বিশেষ নজির হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।


