জাতীয় ডেস্ক
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সংসদ সদস্য না হওয়ায় ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের বর্তমান সদস্য না হওয়ার কারণে ভোট গ্রহণের মূল স্থান সংসদ কক্ষেও তাঁর প্রবেশের সাংবিধানিক বা কার্যপ্রণালিগত সুযোগ থাকছে না। ফলে শীর্ষ সাংবিধানিক পদে প্রার্থী হয়েও নিজের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার এক বিরল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর আজ জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে সরাসরি সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের মধ্যে। সংসদ কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম-৪ আসনটি বর্তমানে শূন্য রয়েছে। ফলে সংসদের বিভক্তি নম্বর অনুযায়ী অবশিষ্ট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫০ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তবে অসুস্থতাজনিত কারণে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ভোট কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন না। বিষয়টি স্পিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে একজন প্রার্থীকে ন্যূনতম ১৭৫ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন বা ভোট পেতে হবে। বর্তমান সংসদের দলীয় শক্তির ভারসাম্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির নিজস্ব সংসদ সদস্য সংখ্যা ২৪৭। এছাড়া বিএনপির কৌশলগত মিত্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ এবং গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের মোট সংসদ সদস্য সংখ্যা ৯০।
ভোটদান পদ্ধতির বিষয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষে নিজ নিজ আসনে বসেই ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোট গ্রহণের সময় ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে ভোটারকে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে এবং মূল ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত ঘরে একইভাবে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর দিতে হবে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, যার জন্য সংসদ কক্ষে নির্ধারিত বিশেষ আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বর্তমানে জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশন চলমান না থাকায় সংবিধান ও নির্বাচনী বিধি অনুসারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের এই বিশেষ বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। এই বিশেষ বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন, যিনি একই সাথে নির্বাচনী কর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। ভোট গ্রহণ শুরুর প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এরপর ভোট গ্রহণ চলাকালীন সম্প্রচার সাময়িক বন্ধ থাকবে এবং ভোট গণনা শুরুর সাথে সাথে পুনঃসম্প্রচার শুরু হবে। ভোট গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর সংসদ কক্ষ থেকেই নির্বাচনী কর্তা হিসেবে সিইসি চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করবেন এবং পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক সরকারি গেজেট প্রকাশিত হবে।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে।
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদে প্রথমবার আইনপ্রণেতাদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। এরপরের দীর্ঘ সময় একাধিক প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। প্রায় ৩৫ বছর পর একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ায় আবারও সংসদ কক্ষে ব্যালট ভোটের মাধ্যমে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান নির্ধারিত হতে যাচ্ছেন।


