জাতীয় ডেস্ক
আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই জাতীয় সংসদের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সৌরশক্তির (সোলার) ওপর নির্ভরশীল করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদের নিয়মিত প্রশ্নোত্তরে সংসদ সদস্য ও দেশবাসীর উদ্দেশে এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘোষণা দেন তিনি। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও টেকসই বিদ্যুৎ খাত গড়ে তোলার লক্ষ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানান তিনি।
স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সংসদীয় অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের মাঝে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও এর প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও এর অবকাঠামো সম্প্রসারণকে সহজলভ্য করতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান উপকরণ যেমন—সোলার প্যানেল, ইনভার্টার এবং ব্যাটারির আমদানির ওপর প্রযোজ্য কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং দুই শতাংশ অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর থেকে শর্ত সাপেক্ষে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এসংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন গত ৮ জুন জারি করেছে, যা সোলার খাতের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে একটি আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করবেন এবং উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, সরকার তাদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে ওই বিদ্যুৎ ক্রয় করবে। এক্ষেত্রে বাল্ক রেটের অতিরিক্ত অর্থ সরকার বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করবে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, রুফটপ সোলার থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় প্রায় ৬ থেকে ৭ টাকা হয়ে থাকে। ফলে এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়া উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাবেন। এই বিশেষ সুবিধাটি দীর্ঘমেয়াদী করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবেন, তাদের জন্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ বিক্রির এই বিশেষ সুবিধা তিন বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপিত রুফটপ সোলার থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকার পরবর্তী তিন বছর এই নির্দিষ্ট ও লাভজনক দরেই ক্রয় করবে।
সরকারি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করার রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে একটি জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচিটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে একটি বিস্তারিত ও যুগোপযোগী গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের জন্য এ বাবদ বিশেষ আর্থিক বরাদ্দও প্রদান করা হয়েছে। বিশেষ করে, দেশের সব বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের জোরদার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেবে।
দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আগামী ১০ বছরের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে এ বিষয়ে কিছু কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। খুব শীঘ্রই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জাতীয় সংসদে এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বহুমুখী উদ্যোগ দেশের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।


