আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অ্যামাজনের একটি কার্গো বিমান রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় রবিবার দুপুর দুইটার দিকে পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ান থেকে ছেড়ে আসা বোয়িং ৭৬৭ মডেলের বিমানটি মায়ামি বিমানবন্দরে অবতরণের সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ার পর বিমানটি বিমানবন্দরের পাশের একটি ব্যস্ত সড়কে গিয়ে কয়েকটি চলন্ত যানবাহনকে সজোরে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনার পরপরই বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। মায়ামি-ডেড ফায়ার সার্ভিসের প্রধান রে জাদাল্লাহ জানিয়েছেন, খবর পেয়ে প্রায় ২০০ জন জরুরি উদ্ধারকর্মী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। বিমানটির ককপিটে পাইলট ও কো-পাইলট আটকা পড়েছিলেন এবং বেশ কয়েকজন গাড়ির ভেতরেও আটকা পড়েছিলেন। দমকলকর্মীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং একটি গাড়ির নিচে চাপা পড়া এক ব্যক্তিসহ অন্যদের উদ্ধার করেন। তবে বিমানের পাইলট ও কো-পাইলটের তাৎক্ষণিক অবস্থা এবং নিহতরা সবাই গাড়ির আরোহী ছিলেন কি না, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার পর মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ঘটনার দিন শেষ হওয়ার আগেই ১৬০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয় এবং প্রায় ৩২৫টি ফ্লাইট বিলম্বের শিকার হয়। অনেক ফ্লাইটকে নির্ধারিত গন্তব্য পরিবর্তন করে প্রায় ২০০ মাইল উত্তরের অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য করা হয়। বিমানবন্দরের বিশেষায়িত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম দিয়ে আগুন নেভানো হলেও দীর্ঘক্ষণ বিমানটির জ্বালানি লিক করায় বাড়তি উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো উদঘাটন করা যায়নি। তবে আবহাওয়াজনিত কোনো প্রভাব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় ওই এলাকায় তীব্র বজ্রঝড় ও ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০ মাইল বেগে দমকা হাওয়া বইছিল। দুর্ঘটনাটি তদন্তের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের (এনটিএসবি) চেয়ারম্যান জেনিফার হোমেন্ডির নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন এক বিবৃতিতে এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং তদন্তকাজে সর্বাত্মক সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে।
বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিক মূল্যায়নে জানিয়েছেন, তদন্তকারীরা মূলত বিমানটির অবতরণ প্রক্রিয়া, ল্যান্ডিং জোনের সঠিক ব্যবহার এবং পাইলটের সিদ্ধান্তগুলো খতিয়ে দেখবেন। সাবেক মার্কিন পরিবহন বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল মেরি শিয়াভো উল্লেখ করেছেন যে, ল্যান্ডিংয়ের সময় বিমানটি রানওয়ের ওপর তুলনামূলক বেশি সময় ধরে ভাসমান ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। এছাড়া, বিমান বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন যে, মায়ামি বিমানবন্দরের রানওয়েতে দুর্ঘটনা রোধে বিশেষভাবে নির্মিত ‘ইঞ্জিনিয়ারড অ্যারেস্টিং সিস্টেম’ (ইএমএএস)—যা অতিরিক্ত রানওয়ে ওভাররান ঠেকাতে সহায়ক—তার অনুপস্থিতি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে কি না, তাও তদন্তের অংশ হতে পারে। মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশটির একশর বেশি বিমানবন্দরে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
উল্লেখ্য, দুর্ঘটনার শিকার প্রায় ৩২ বছরের পুরনো বোয়িং ৭৬৭ বিমানটি মূলত যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এয়ারলাইনসে ব্যবহৃত হওয়ার পর ২০১৫ সালে কার্গো বিমানে রূপান্তরিত করা হয়। বিমানটি নর্থ ক্যারোলাইনাভিত্তিক কার্গো পরিবহন সংস্থা ২১ এয়ারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। বর্তমানে ফেডারেল সংস্থাগুলোর যৌথ তদন্ত শেষ হলেই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এসংক্রান্ত দায়দায়িত্ব স্পষ্টভাবে জানা যাবে।


