সৌদি আরব–পাকিস্তান সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্কের সম্পৃক্ততা: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন জোটের ইঙ্গিত

সৌদি আরব–পাকিস্তান সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্কের সম্পৃক্ততা: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন জোটের ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্ক যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সক্রিয় আলোচনা চলছে। কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে চলমান আলোচনা ইতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে এবং এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় সামরিক সমীকরণ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইরানকে ঘিরে বিদ্যমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আংকারা ও রিয়াদের সঙ্গে ইসলামাবাদের সামরিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। যৌথ প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয় এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়—এই তিনটি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে আলোচনা অগ্রসর হচ্ছে। আলোচনায় প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামো, সক্ষমতা বিনিময় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সমন্বিত ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের অস্ত্র রপ্তানি কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্যভাবে সামনে এসেছে। দেশটি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের চুক্তি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি বড় অঙ্কের অস্ত্র সরবরাহ চুক্তি চূড়ান্ত করার তথ্য পাওয়া গেছে। ওই চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিমান, নজরদারি ও আক্রমণাত্মক ড্রোন এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব সরবরাহ পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের কৌশলের অংশ।

সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হলে এটি তিনটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশের কৌশলগত শক্তিকে একত্র করবে। সৌদি আরব আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র, তেলসম্পদসমৃদ্ধ অর্থনীতি এবং জি–২০-এর সদস্য। একই সঙ্গে দেশটি ইসলামের দুই পবিত্র নগর মক্কা ও মদিনার তত্ত্বাবধায়ক। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, যার রয়েছে বড় আকারের সশস্ত্র বাহিনী ও ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্প। অন্যদিকে তুরস্ক ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি কৌশলগত রাষ্ট্র, যার সেনাবাহিনী উত্তর আটলান্টিক জোটের মধ্যে আকারের দিক থেকে অন্যতম বৃহৎ।

তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয় দেশই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় অস্ত্র উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান জোরদার করেছে। তুরস্ক বিভিন্ন সংঘাতে ব্যবহৃত ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি রপ্তানি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার একাধিক দেশে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। পাকিস্তান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা খাতের সক্ষমতাকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্যেই দেশটি যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিতে সক্রিয় হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্ক—উভয় দেশেরই ঘনিষ্ঠ কৌশলগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। এক দশকেরও বেশি সময় আগে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে লিবিয়া ও মিসর ইস্যুতেও তাদের অবস্থান ভিন্ন ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে আঞ্চলিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ পরিবর্তিত হওয়ায় দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে এবং সিরিয়া, সুদানসহ কয়েকটি স্পর্শকাতর অঞ্চলে দুই দেশের কৌশলগত অবস্থান কাছাকাছি এসেছে। একই সময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কিছু ইস্যুতে মতপার্থক্যও প্রকাশ পেয়েছে, বিশেষ করে ইয়েমেন ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে।

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে তুরস্ক–সৌদি আরব–পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো ও শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু সামরিক সহযোগিতাই নয়, বরং আঞ্চলিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ