কাবুলসহ একাধিক শহরে পাকিস্তানের বিমান হামলা, ‘খোলা যুদ্ধ’ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

কাবুলসহ একাধিক শহরে পাকিস্তানের বিমান হামলা, ‘খোলা যুদ্ধ’ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কান্দাহারসহ একাধিক স্থানে শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। কয়েক মাস ধরে সীমান্তে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ ও উত্তেজনার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে ‘খোলা যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে বলে ঘোষণা দেন। সাম্প্রতিক এ ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিদেশি বার্তা সংস্থার সাংবাদিকরা কাবুল ও কান্দাহার থেকে বিস্ফোরণের শব্দ এবং যুদ্ধবিমান চলাচলের খবর জানিয়েছেন। তালেবান সরকারের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কান্দাহারেও জেট বিমানের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি দাবি করেছেন, ‘অপারেশন গজব লিল–হক’ নামের অভিযানে আফগান তালেবানের ২৭টি সামরিক পোস্ট ধ্বংস করা হয়েছে এবং আরও ৯টি পোস্ট নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে তালেবানের ৮০টিরও বেশি ট্যাংক, কামান ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এ দাবি সম্পর্কে আফগানিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের স্থানীয় কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, নাঙ্গারহারের একটি শরণার্থী শিবিরে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালিয়েছে। ওই শিবিরে পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা আফগান নাগরিকরা অবস্থান করছিলেন। কর্মকর্তাদের দাবি, এতে অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সাতজন নারী ও দুইজন পুরুষ। আহতদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েক মাস ধরে ছিটেফোঁটা সংঘর্ষ চললেও সাম্প্রতিক বিমান হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগান ভূখণ্ডে অবস্থানরত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের সীমান্তে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্রাসী অবস্থানের কথা বলছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত, যা ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত, ঐতিহাসিকভাবে বিরোধপূর্ণ।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান আলোচনাকে সহজভাবে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত রয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকে তেহরান একাধিকবার মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গুতেরেস উভয় দেশকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সব নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছেন। বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে তুরস্কও দুই দেশের মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় আলোচনার বিকল্প নেই বলে আঙ্কারা মনে করে। মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরবও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারের সঙ্গে টেলিফোনে বর্তমান পরিস্থিতি ও উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সরকারি সফরে বর্তমানে ইশাক দার সৌদি আরবে অবস্থান করছেন।

সাম্প্রতিক এ সামরিক পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, শরণার্থী পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি রোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংযম ও সংলাপের আহ্বান অব্যাহত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ