অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত শিগগিরই শেষ হতে পারে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন ইঙ্গিতের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে মূল্য হ্রাস পেয়েছে। মঙ্গলবার সকালে এশীয় বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে তেলের দামের পতনের প্রভাবে এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল’-এর দাম প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯২ দশমিক ৫০ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন হওয়া অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলার ৬০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাতজনিত অনিশ্চয়তার কারণে তেলের দামে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেলেও এই মন্তব্যের পর বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক পরিস্থিতি জ্বালানি তেলের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় সেখানে যে কোনো ধরনের সংঘাত বা উত্তেজনা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি করে। এর ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায় এবং তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে।
তবে সাম্প্রতিক এই পতনের পরও সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় তেলের দাম এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। ফলে স্বল্পমেয়াদে দাম কিছুটা কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তেলের বাজারে ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।
তেলের দামের এই পরিবর্তনের প্রভাব এশিয়ার শেয়ারবাজারেও প্রতিফলিত হয়েছে। জ্বালানি ব্যয় কমার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে কিছুটা বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে মঙ্গলবারের লেনদেনে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক ৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, এশিয়ার অনেক দেশ জ্বালানি তেলের জন্য আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল আমদানির ওপর এই দেশগুলোর নির্ভরতা বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা শিল্প ও পরিবহন খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ওপর।
অন্যদিকে তেলের দাম কমলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কমে আসে, যা অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। অঞ্চলটিতে সংঘাত বা উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিফলিত হয়। ফলে বাজারের অংশীজনেরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বাজারে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা মূলত ভবিষ্যৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার প্রতিফলন বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, সংঘাত পরিস্থিতির দ্রুত অবসান হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আরও স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।


