অর্থনীতি প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার দেশের অর্থনীতিকে অগ্রসর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই কাঠামোয় উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
শুক্রবার সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারার আওতায় দেওয়া এক বিস্তৃত বিবৃতিতে তিনি এসব তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সব নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
তিনি সংসদে আরও উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া নীতি ও কাঠামোগত পরিবর্তন বর্তমান অর্থনৈতিক ভিত্তি গঠনে ভূমিকা রেখেছে। অতীতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিভিন্ন সময়ের অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতাকে বর্তমান উন্নয়ন কৌশলের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাতে চাপ, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বিদ্যমান। এসব সমস্যা মোকাবেলায় বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সব পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃষক, জেলে ও প্রাণিসম্পদ খাতের শ্রমজীবীদের জন্য পৃথক কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, কৃষিখাতে সহায়তা বাড়াতে নির্দিষ্ট পর্যায়ে কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং গ্রামীণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্লু ইকোনমি, ইকো-ট্যুরিজম এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে দেশীয় ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের অংশ হিসেবে কর আদায় ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এর মাধ্যমে কর-জিডিপি অনুপাত ২০৩৪ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং পুঁজিবাজার উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংসদে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অনিশ্চয়তার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন সময়কালে জ্বালানি ভর্তুকি ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জ্বালানি সাশ্রয়, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি, বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধান এবং কিছু ক্ষেত্রে সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়াতে জ্বালানির মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। তবে দক্ষ নীতি ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলেও তিনি সংসদে উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রমে জনগণের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এবং অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।


