আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাতে পৌঁছানো এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। আলোচনায় অংশ নিতে যাওয়া এই সফরকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানি প্রতিনিধি দলে স্পিকার গালিবাফ ছাড়াও রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, সুপ্রিম ন্যাশনাল কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর, ডিফেন্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী আকবর আহমাদিয়ান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোল নাসের হেম্মাতি এবং আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা। প্রতিনিধিদলের এই গঠন থেকে বোঝা যায়, আলোচনাটি কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কৌশলগত ইস্যুকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, তাদের পক্ষ থেকে আলোচনায় সদিচ্ছা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের অভিজ্ঞতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ববর্তী আলোচনাগুলো প্রায়শই ব্যর্থতা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর চুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে ইরানও আলোচনায় অগ্রসর হতে প্রস্তুত।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু ঘিরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন–জেসিপিওএ) ঘিরে মতবিরোধের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে একাধিক দফায় আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হলেও স্থায়ী সমঝোতা অর্জন সম্ভব হয়নি।
বর্তমান আলোচনার উদ্যোগ এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্য ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আলোচনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে আলোচনায় অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধি দলও পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই দলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনারসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক প্রতিনিধি।
দুই পক্ষের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের একই স্থানে উপস্থিত হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে উভয় পক্ষের বক্তব্যেই পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, যা আলোচনার অগ্রগতিকে জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা সফল হলে তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের জন্যই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্যও নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে। অন্যদিকে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল আলোচনার ফলাফলের দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছে, কারণ সম্ভাব্য যেকোনো অগ্রগতি বা ব্যর্থতা বৈশ্বিক কূটনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।


