আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ বিপজ্জনক, ব্রেক্সিটের মতো পরিণতি হতে পারে: মার্ক কার্নি

আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ বিপজ্জনক, ব্রেক্সিটের মতো পরিণতি হতে পারে: মার্ক কার্নি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কানাডার তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টাকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার রাজনৈতিক তৎপরতাকে যুক্তরাজ্যের ‘ব্রেক্সিট’-এর সঙ্গে তুলনা করে একে অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের গণভোটের চূড়ান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক পরিণতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষ হয়তো পুরোপুরি অবগত নয়। সম্প্রতি ওটাওয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন।

২০১৬ সালে এক ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (যা ব্রেক্সিট নামে পরিচিত) প্রক্রিয়াকালীন সময়ে মার্ক কার্নি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নরের দায়িত্বে ছিলেন। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির সেই জটিল রূপান্তরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কার্নি বলেন, ব্রেক্সিটের সময় জনগণকে বোঝানো হয়েছিল যে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ভোট দিলে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে এবং বাকি বিষয়গুলো পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রেক্সিটের এক দশক পেরিয়ে গেলেও ব্রিটিশ জনগণ এখনো এমন এক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার জন্য তারা আসলে প্রস্তুত ছিল না। বিচ্ছিন্নতার পূর্ণ পরিণতি সম্পর্কে পূর্বধারণা না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টায় সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জোরদার হয়েছে। সেখানকার আন্দোলনকারীদের দাবি, তারা কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার প্রশ্নে একটি প্রাদেশিক গণভোট আয়োজনের লক্ষ্যে তিন লাখের বেশি নাগরিকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে। আলবার্টার স্থানীয় আইন অনুযায়ী, গণভোটের আনুষ্ঠানিক দাবি তোলার জন্য এই সংখ্যাটি পর্যাপ্ত। তবে সম্প্রতি আলবার্টার একটি আদালত এই পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। আদালতের রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই বড় পদক্ষেপ নেওয়ার আগে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শ করেনি। প্রদেশটি কানাডা থেকে পৃথক হলে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার ও নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে যথাযথ প্রক্রিয়াসমূহ অনুসরণ না করায় এই নাগরিক উদ্যোগটি আইনিভাবে বৈধতা পাওয়ার যোগ্য নয়।

আদালতের এই সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন আলবার্টার রক্ষণশীল প্রিমিয়ার (প্রাদেশিক সরকারপ্রধান) ডেনিয়েল স্মিথ। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, আদালতের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না—এমনভাবে নতুন ব্যালট প্রশ্ন তৈরি করে তারা গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবেন। এর আগে গত অক্টোবরে স্মিথ ঘোষণা করেছিলেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত কি না, তা তিনি আলবার্টার জনগণের ভোটের মাধ্যমে জানতে চাইবেন। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আলবার্টাকে কানাডার অংশ হিসেবেই রেখে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

প্রিমিয়ার স্মিথের এই প্রস্তাবিত ব্যালট প্রশ্নের তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, কোনো দেশ বা প্রদেশ বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে যখন প্রচারণা চালায়, তখন প্রায়ই দাবি করা হয় যে এতে কোনো ঝুঁকি নেই এবং এটি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করবে। কার্নির মতে, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি ফাঁকা আওয়াজ বা রাজনৈতিক কৌশল মাত্র, যা সার্বিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে পারে।

সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, আলবার্টার প্রায় ৫০ লাখ বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রদেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বিচ্ছিন্নতাবাদের পক্ষে সমর্থনের এই হার এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মূল অভিযোগ, ওটাওয়ার কেন্দ্রীয় সরকার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে আলবার্টার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তেলশিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি পরিবেশগত উদ্বেগের অজুহাত তুলে এই খাতে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত এই গণভোটে যদি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পরাজিতও হয়, তবুও এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কানাডার অভ্যন্তরীণ ফেডারেল কাঠামো ও রাজনৈতিক সমীকরণকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে ফেলবে। আলবার্টার এই স্বাধিকার আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক টানাপোড়েন নয়, বরং কানাডার জাতীয় সংহতির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ