জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি স্থাপনের এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় নিজের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করল।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে (রিঅ্যাক্টর) শক্তি উৎপাদনের জন্য মোট ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেলের প্রয়োজন হবে। প্রতিটি বান্ডেল মূলত ১৫টি করে ইউরেনিয়াম প্লেটসমৃদ্ধ রড নিয়ে গঠিত। বর্তমানে ১৬৮টি বান্ডেল প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে, যার মধ্যে ১৬৩টি সরাসরি চুল্লিতে ব্যবহৃত হবে এবং অবশিষ্ট ৫টি ভবিষ্যতে জরুরি প্রয়োজনের জন্য সংরক্ষিত রাখা হবে। রিমোট কন্ট্রোলড মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি বান্ডেল নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থাপন করতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।
রূপপুর প্রকল্পের কারিগরি প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্বালানি লোড করার পর শুরু হবে ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা পরমাণু বিভাজন প্রক্রিয়া। এই বিভাজনের ফলে বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হবে, যা পানিকে বাষ্পে রূপান্তরিত করবে। সেই বাষ্পের চাপে টারবাইন ঘোরানোর মাধ্যমে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রকল্পটির প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট করে, অর্থাৎ দুটি ইউনিট পূর্ণোদ্যমে চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্ষমতা। নকশা অনুযায়ী কেন্দ্রটির প্রাথমিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই সময়সীমা আরও ৩০ বছর বৃদ্ধি করা সম্ভব, যার ফলে প্রায় ৯০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটি থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় এটি অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিবেশবান্ধব।
জ্বালানি ব্যবহারের সাশ্রয়ী দিকটিও দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি স্বস্তির খবর। একবার পূর্ণমাত্রায় জ্বালানি লোড করার পর পরবর্তী দেড় বছর বা ১৮ মাস কেন্দ্রটি থেকে টানা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। ফলে কয়লা, তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস চালিত কেন্দ্রের মতো প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির ঝুঁকি ও ব্যয় এখানে নেই। ১৮ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর পুরো জ্বালানি একসাথে পরিবর্তন করতে হবে না; বরং পর্যায়ক্রমে এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি রড প্রতিস্থাপন করলেই কেন্দ্রটির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
তবে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হলেই তাৎক্ষণিকভাবে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হচ্ছে না। জ্বালানি স্থাপনের পর পরবর্তী কয়েক মাসে রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন কারিগরি দিক যাচাইয়ের জন্য শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) সকল প্রোটোকল অনুসরণ করার পরই ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে। সব ধাপ সফলভাবে শেষ হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সফল কার্যক্রম শুরু দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমাতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এটি দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তার একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই উচ্চপ্রযুক্তি সম্পন্ন প্রকল্পের পরিচালনা ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বজায় রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।


