জাতীয় ডেস্ক
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে যারা শহরমুখী হচ্ছেন, তাদের সংকটকে কেবল মানবিক বা আপদকালীন আপদ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় জননীতির (পাবলিক পলিসি) অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, এই ক্রমবর্ধমান অভিবাসন প্রক্রিয়াকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ) আয়োজিত এক জাতীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) সহযোগিতায় ‘বাংলাদেশে জলবায়ু-সংক্রান্ত অভিবাসীদের অভিযোজনগত প্রতিবন্ধকতা এবং স্থানীয়ভাবে নেতৃত্বাধীন সমাধান’ শীর্ষক এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
তথ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, অতীতে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগই নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও অভিবাসনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। বর্তমান সরকার সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি সমস্যা গভীরভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে। আমরা জনমানুষের প্রতিটি সমস্যা সমাধানে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ।”
পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ দিয়ে মন্ত্রী বিজ্ঞানের সূত্র উল্লেখ করে বলেন, বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরে মানুষের বসবাসের যোগ্য কোনো গ্রহ খুঁজে পায়নি। ফলে এই ধরিত্রীকেই আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাসযোগ্য রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, গবেষক এবং সুশীল সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আরএমএমআরইউ-এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী। গবেষণালব্ধ তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, অভিবাসন মানেই শুধু ঢাকা শহর নয়। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, এটি সঠিক সময়ে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়। তিনি উল্লেখ করেন, খুলনা বা অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে জীবনধারণের তাগিদে ঢাকায় আসছে। যদি বিভাগীয় শহর বা জেলা পর্যায়ে শিল্পায়ন ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং কার্যকর ‘রিজনাল গ্রোথ সেন্টার’ বা আঞ্চলিক উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তবে মানুষ নিজ এলাকাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এতে রাজধানীর ওপর বাড়তি চাপ কমবে।
অধ্যাপক সিদ্দিকী আরও জানান, মানুষ কেবল অর্থনৈতিক সংকটেই শহরমুখী হয় না; অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হয়রানি থেকেও বাঁচতে তারা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের ওপর ভিত্তি করে টেকসই সমাধানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
কর্মশালায় গবেষণার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের আঞ্চলিক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক নাজিয়া হায়দার। এছাড়া অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের গবেষণা উপদেষ্টা ড. ফ্রাঙ্ক ভলমার দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতির মানবিক ও সামাজিক মূল্য নিয়ে একটি বিশেষ উপস্থাপনা পেশ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার মানুষের পুনর্বাসন এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের অভিবাসন ও সুরক্ষা বিষয়ক আঞ্চলিক উপদেষ্টা লিসা-তানিতা গ্রেমিঙ্গার। আরএমএমআরইউ-এর সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওবায়দুল হকের সঞ্চালনায় কর্মশালায় আরও আলোচনা করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, বিশিষ্ট স্থপতি ইকবাল হাবিব, ক্যারিতাস-এর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরা এবং গ্লোবাল ইনসাইটস ম্যানেজার ড. থান্নালেচিমি হাউসেট।
কর্মশালায় বক্তারা যশোর ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার ও নাগরিক সমাজের কার্যকর ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়। সভায় উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা একমত পোষণ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসীদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল করতে হলে নীতিমালার আমূল পরিবর্তন এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য।


