জাতীয় ডেস্ক
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ পানির উৎস সুরক্ষায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে পানি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর কাকরাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তিনি সভায় বিস্তারিত আলোচনা করেন।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বর্তমানে এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উদ্বেগজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে পুরো পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে এক ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই নদী, খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক পানিশোধন প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে।
নিরাপদ পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিরাজমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “নিরাপদ পানির সংকট কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ। শহরের নিম্নবিত্ত ও বস্তিবাসী মানুষেরা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।” এই বৈষম্য নিরসন করে অন্তর্ভুক্তিমূলক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে আরও ঘনিষ্টভাবে সমন্বিত কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সারা দেশে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে একাধিক মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার জন্য কেবল অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়, বরং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল, ইউনিসেফের প্রতিনিধি স্ট্যানলি গওয়াবুয়া এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ। বক্তারা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পানি দূষণ রোধ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের ওপর বিশেষ জোর দেন। তাঁরা জানান, পানির উৎস দূষণমুক্ত রাখতে না পারলে ভবিষ্যতে পানিশোধন প্রক্রিয়া আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস হিসেবে নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) মতো বিকল্প ব্যবস্থাগুলো জনপ্রিয় করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে পানির অপচয় রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা না গেলে সম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সেমিনারে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনার শেষে মন্ত্রী নিরাপদ পানি সরবরাহে নিয়োজিত মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা প্রদান করেন। উপস্থিত প্রতিনিধিরা একমত পোষণ করেন যে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে পানির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে ২০২৬ সালের বিশ্ব পানি দিবসের মূল অঙ্গীকার।


