জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মুক্তিযুদ্ধ কার্ড’ ব্যবহারের যৌক্তিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি উল্লেখ করেছেন, জামায়াতে ইসলামী যতক্ষণ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে তাদের কৃত অপরাধের জন্য নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশের রাজনীতিতে এই প্রসঙ্গের প্রাসঙ্গিকতা বজায় থাকবে।
আজ বৃহস্পতিবার ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেল ‘জাহেদ টকস’-এ সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে সংসদ সদস্যদের কঠোর বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা সামনে আসে।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ফৌজদারি অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি অনস্বীকার্য। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, দখলদার বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশ করতে গিয়ে দলটি বিভিন্ন ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যটি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষ তাদের ভুলের দায় স্বীকার না করছে, ততক্ষণ রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ইস্যুটি একটি কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে থেকে যাবে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং জামায়াতের কর্মকাণ্ড নিয়ে জোরালো বক্তব্য প্রদান করেন। এই বক্তব্যগুলোকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির অবস্থান নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা ও বিশ্লেষণের ঝড় উঠেছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, বিএনপি নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কথা বলে রাজনৈতিকভাবে ভুল করছে অথবা সমাজে বিভক্তি তৈরি করছে।
এসব সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, যারা দাবি করছেন যে মুক্তিযুদ্ধের কথা পুনরায় সামনে এনে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা মূলত দলটির আদর্শিক বিরোধী পক্ষ। তিনি মনে করেন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ কম। বরং এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে যারা বিভক্তির কথা বলেন, তাদের গণতন্ত্রের প্রকৃত সংজ্ঞা পুনরায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক বিভাজন প্রসঙ্গে ডা. জাহেদ উর রহমান একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তাঁর মতে, গণতন্ত্র মানেই মতাদর্শিক বিভাজন। তিনি বলেন, “পৃথিবীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকার অর্থই হলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন রয়েছে। প্রতিটি দল তাদের নির্দিষ্ট চিন্তাধারার ভিত্তিতে জনমত গঠন করে। বৃহত্তর অর্থে এটি এক ধরনের বিভাজন, যা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।”
তবে এই বিভাজনের ক্ষেত্রে তিনি একটি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন কখনোই এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয় যা সমাজে ঘৃণা উৎপাদন করে অথবা অন্য কোনো নাগরিকের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে। বিভাজন হতে হবে আদর্শিক এবং গঠনমূলক।
সাবেক সরকার প্রধান শেখ হাসিনার শাসন আমলের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, বিগত সরকার যেভাবে সমাজে বিভাজন তৈরি করেছিল, তা ছিল নেতিবাচক। সেই সময়ে বিভাজনকে ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে হলে পূর্ববর্তী সরকারের সেই দমনমূলক বিভাজনের নীতি পরিহার করা আবশ্যক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডা. জাহেদ উর রহমানের এই বক্তব্য দেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক মেরুকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে প্রধান দলগুলোর অবস্থান জনগণের কাছে আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার এই অবস্থান থেকে এটি স্পষ্ট যে, জাতীয় সংহতি ও সুষ্ঠু রাজনীতির স্বার্থে অতীতের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নিরসন করা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অপরিহার্য।


