জাতীয় ডেস্ক
আসন্ন ঈদুল আজহা এবং বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে দেশের নৌপথে যাত্রী, কোরবানির পশু ও পণ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থায় কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না।
রবিবার (১০ মে, ২০২৬) রাজধানীর ইস্কাটনে লেডিস ক্লাবে ‘নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব নির্দেশনা প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক, রেল ও নৌ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এছাড়া নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া, বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন।
নৌপ্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠানগুলো অনেক সময় কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। আলোচনা ও সুন্দর কথার ভিড়ে বাস্তব পরিবর্তনের চিত্রটি আড়ালে পড়ে থাকে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে কাজের গুণগত মানের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, “অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে করার চেয়ে একটি কাজ যদি আমরা শতভাগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবেই সাধারণ মানুষ তার সুফল পাবে।”
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নৌপথকে সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং আরামদায়ক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিকভাবেও এটি পণ্য পরিবহনের জন্য নিরাপদ পথ। দেশে সড়কপথের তুলনায় নৌপথে দুর্ঘটনার হার কম হলেও আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। জাহাজ মালিক, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা গেলে নৌ দুর্ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নৌপথের বর্তমান সংকট তুলে ধরে মো. রাজিব আহসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে দেশের নদীগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে এবং বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠছে। এই প্রতিকূলতার মাঝেও নৌপথকে সচল রাখতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি আধুনিক ও সময়োপযোগী নৌযান চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। এক সময়ের ভয়াবহ জাহাজডুবির ঘটনাগুলো এখন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের প্রচেষ্টায় কমে এসেছে উল্লেখ করে তিনি এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দেন।
নৌযানের ফিটনেস এবং সার্ভে সনদ নিয়ে জনমনে থাকা অভিযোগের বিষয়েও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রুট পারমিট ও সার্ভে করার সময় সব ঠিক থাকলেও পরবর্তীতে তদারকির অভাবে অনেক নৌযান নিয়ম লঙ্ঘন করে। পরিদর্শনের সময় সাময়িকভাবে জাহাজ সাজিয়ে রাখার প্রবণতা বন্ধে আকস্মিক ও নিয়মিত পরিদর্শনের কঠোর নির্দেশ দেন তিনি।
আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদী উত্তাল থাকার আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যাত্রীবাহী নৌযানগুলোকে অবশ্যই যথাযথ কাগজপত্র ও জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম নিশ্চিত করে চলাচল করতে হবে। ঈদযাত্রায় ছোট ছোট নৌপথে ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যদের বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “সামান্য সময় বাঁচাতে গিয়ে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে উঠে নিজের জীবন বিপন্ন করে। একটি দুর্ঘটনা যেমন অপূরণীয় প্রাণহানি ঘটায়, তেমনি সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।”
প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান তার বক্তব্যের সমাপ্তিতে নৌপথের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করেন, মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে শ্রমিক-নাবিক পর্যন্ত সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে দেশের নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি শক্তিশালী ও নিরাপদ কাঠামোতে দাঁড়াবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারাও নৌ নিরাপত্তার কারিগরি ও আইনি দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নৌপথের শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিত থেকে অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয়।


