আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন সরকারে অস্থিরতা আরও তীব্রতর হয়েছে। সর্বশেষ পদত্যাগী মন্ত্রী হিসেবে জুবাইর আহমেদের সরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে স্টারমার প্রশাসনের রাজনৈতিক সংকট এক নতুন মাত্রা ধারণ করল। গত ৫ জুলাই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৪ বছরের রক্ষণশীল শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এলেও, এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে জনপ্রিয়তায় ব্যাপক ধস এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মুখে পড়েছে বর্তমান সরকার।
স্বাস্থ্য বিষয়ক সহকারী মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা জুবাইর আহমেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে তার পদত্যাগপত্র প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষ বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রমে হতাশ। তার মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে কিয়ার স্টারমার জনগণের বিশ্বাস ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। জুবাইর আহমেদের এই আকস্মিক বিদায়কে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান ফাটলের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, জুবাইর আহমেদের পদত্যাগের আগে গত কয়েক দিনে মন্ত্রিসভার আরও তিন প্রভাবশালী সদস্য তাদের পদ ছেড়েছেন। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির শোচনীয় ফলাফলই এই পদত্যাগের হিড়িক শুরু করে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিরোধী দল তো বটেই, এমনকি নিজ দলের অভ্যন্তরেও এখন কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে ব্রেক্সিট পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের অস্পষ্ট ভূমিকা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ‘পরিবর্তন’ এবং ‘স্থিতিশীলতার’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন কিয়ার স্টারমার। ভোটারদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তিনি রক্ষণশীল আমলের বিশৃঙ্খলা দূর করে ব্রিটিশ রাজনীতিতে এক নতুন ধারা প্রবর্তন করবেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন বিতর্কিত নীতি গ্রহণ এবং জনমত জরিপে অব্যাহত অবনতি সরকারকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের বিমুখ হওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, লেবার পার্টির চিরাচরিত ঘাঁটিগুলোতেও ফাটল ধরেছে।
ব্রিটিশ রাজনীতির এই অস্থির পরিস্থিতি কেবল মন্ত্রিসভার রদবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি বর্তমান সরকারের এই টালমাটাল অবস্থাকে পুঁজি করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি জোরালো করছে। অন্যদিকে, লেবার পার্টির ভেতরে একটি অংশ কিয়ার স্টারমারের বিকল্প নেতৃত্বের বিষয়েও গুঞ্জন শুরু করেছে। সরকারের বিভিন্ন নীতির পরিবর্তন এবং নানা বিষয়ে দলের ভেতরকার মতবিরোধ এখন জনসমক্ষে চলে আসায় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ হারানো আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রিসভা থেকে একের পর এক মন্ত্রীর পদত্যাগ স্টারমার সরকারের জন্য এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন আনতে হবে এবং ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, ব্রেক্সিট ও দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর যে স্বপ্ন নিয়ে লেবার পার্টি ক্ষমতায় এসেছিল, তা বড় ধরনের ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হতে পারে। বর্তমানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গতিপ্রকৃতি এবং কিয়ার স্টারমারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।


