আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসনে ইরান যদি শান্তি চুক্তিতে সম্মত না হয়, তবে ওয়াশিংটন আবারও সামরিক হামলা চালাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে তেহরানের কাছ থেকে ‘সঠিক উত্তর’ পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে ইচ্ছুক বলেও তিনি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, মার্কিন এই হুঁশিয়ারির জবাবে পাল্টা কঠোর অবস্থান নিয়ে ইরান সতর্ক করেছে যে, নতুন করে কোনো আগ্রাসন চালানো হলে চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। দুই দেশের এমন মুখোমুখি অবস্থানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বুধবার মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছেছে এবং এটি যেকোনো মুহূর্তে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ওয়াশিংটন যদি সঠিক জবাব না পায়, তবে খুব দ্রুতই সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হবে এবং এর জন্য মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করবেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এটি কয়েক দিন হতে পারে, তবে সবকিছুই খুব দ্রুত ঘটবে। ট্রাম্প আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন যেন বড় কোনো রক্তপাত ছাড়াই একটি চুক্তির মাধ্যমে সংকটের সমাধান হয়, অন্যথায় পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘এপিক ফিউরি’ অভিযান স্থগিত করার পর ছয় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ সমাপ্তির দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের নেতিবাচক প্রভাব খোদ মার্কিন রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গ্যাসোলিনের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামিয়েছে। ফলে এই চুক্তি মার্কিন প্রশাসনের জন্যও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই হুঁশিয়ারির জবাবে তেহরানও তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইরানের এলিট সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে আবারও আগ্রাসন চালানো হলে এবার আঞ্চলিক সংঘাতটি মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে। শত্রুপক্ষ কল্পনাও করতে পারবে না, এমন সব কৌশলগত স্থানে বিধ্বংসী আঘাত হানা হবে বলে সতর্ক করেছে বাহিনীটি। একই সাথে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও শান্তি আলোচনার শীর্ষ মুখ মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফ এক অডিও বার্তায় গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, আমেরিকার প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে তারা শান্তি চুক্তির আড়ালে নতুন কোনো সামরিক আক্রমণের ছক কষছে।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক তৎপরতাও সচল রয়েছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে জানানো হয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপ করেছেন। ফোনালাপে এরদোয়ান চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে একটি ‘যৌক্তিক ও কূটনৈতিক সমাধান’ সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এবং মধ্যস্থতা বজায় রাখার প্রত্যয় জানান।
অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তাঁর দেশের চূড়ান্ত অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান যেকোনো ন্যায়সংগত আলোচনার জন্য সর্বদা প্রস্তুত আছে, তবে বলপ্রয়োগ বা সামরিক হুমকি দিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা একটি অলীক কল্পনা মাত্র।
কূটনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ মার্কিন আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর উভয় পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ।


