আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির চিপের বৈশ্বিক চাহিদাকে পুঁজি করে রেকর্ড মুনাফা অর্জন করেছে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট এনভিডিয়া। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল প্রান্তিক শেষে কোম্পানিটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে। আর্থিক খতিয়ান অনুযায়ী, এই মুনাফা পূর্ববর্তী প্রান্তিকের তুলনায় ৩৭ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২০০ শতাংশেরও বেশি। মূলত জেনারেটিভ এআই এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের প্রসারের ফলে বিশ্বজুড়ে উন্নত চিপের যে অভাবনীয় চাহিদা তৈরি হয়েছে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে প্রতিষ্ঠানটির এই রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে।
ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচিত প্রান্তিকে কোম্পানিটির মোট রাজস্ব আয় ৮৫ শতাংশ বেড়ে ৮১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এনভিডিয়ার এই আয়ের সিংহভাগই এসেছে তাদের ডেটা সেন্টার খাত থেকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ সরবরাহের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই খাতের আয় এক বছরে ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির হার্ডওয়্যার ইউনিটও ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে; এই খাত থেকে আয় ২৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে। চলতি প্রান্তিকের পূর্বাভাসে কোম্পানিটি জানিয়েছে, বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় তাদের রাজস্ব আয় আরও বেড়ে ৯১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ব্যবসায়িক এই সাফল্য প্রসঙ্গে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেনসেন হুয়াং জানান, বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির চাহিদা এখন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে, যা মূলত ‘এজেন্টিক এআই’ বা স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব রূপ নেওয়ার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর মতে, এআই প্রযুক্তি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক ধারণা বা গবেষণার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিভিন্ন শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও মূল্যবান প্রাতিষ্ঠানিক কাজে সরাসরি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারগুলো এখন প্রথাগত কম্পিউটিং থেকে সরে এসে এআই-ভিত্তিক কম্পিউটিং পরিকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ করছে, যা এনভিডিয়ার চিপের বাজারকে দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী করছে।
এই অভাবনীয় সাফল্যের পর শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঘোষণা দিয়েছে এনভিডিয়া কর্তৃপক্ষ। কোম্পানিটি বাজার থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের নিজস্ব শেয়ার পুনঃক্রয় (শেয়ার বাইব্যাক) কর্মসূচি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতি শেয়ারে ত্রৈমাসিক লভ্যাংশের পরিমাণ বিদ্যমান ০ দশমিক ০১ ডলার থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে ০ দশমিক ২৫ ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। লভ্যাংশ ও শেয়ার পুনঃক্রয়ের এই সিদ্ধান্ত বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে আর্থিক খতিয়ানে এমন চমকপ্রদ সাফল্যের খবরের পরও মার্কিন শেয়ারবাজারে এনভিডিয়ার শেয়ারের মূল্যে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বর্ধিত লেনদেন বা ‘আফটার-আওয়ার্স ট্রেডিং’-এ কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এনভিডিয়ার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোয় প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার পারদ এখন আকাশচুম্বী। ফলে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জনের পরও তা বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বড় কোনো চমক দিতে পারেনি, যার প্রভাব পড়েছে সাময়িক শেয়ার মূল্যে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে একটি বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের রূপান্তর হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এনভিডিয়া কর্তৃক বিপুল অঙ্কের শেয়ার বাইব্যাক এবং লভ্যাংশ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, অতি-দ্রুতবর্ধনশীল একটি স্টার্টআপ-সদৃশ পর্যায় পার করে প্রতিষ্ঠানটি এখন একটি স্থিতিশীল ও পরিপক্ক করপোরেট কাঠামোয় পৌঁছাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টদের একটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিপের প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদার পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন জীবনে এআই প্রযুক্তির প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, তা আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে।


